মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে ফের ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন এবং দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির চরম সংঘাতের মাঝে আবারও ইসরাইলের রক্ষাকর্তা হিসেবে সরাসরি অবতীর্ণ হলো ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইসরাইলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের চালানো ভয়াবহ ও আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে সরাসরি অংশ নিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তেহরানের ছোড়া বেশ কিছু শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন সেনারা আঘাত হানার আগেই মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে বলে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল অ্যারাবিয়াকে নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (পেন্টাগন) ওই কর্মকর্তারা জানান, হামলার পর প্রাথমিক প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এখনও চলছে। তবে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে মার্কিন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে একাধিক ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক—উভয় ধরনের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধজাহাজ এবং রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়াশিংটন যে কোনো আঞ্চলিক হুমকি থেকে তেল আবিবকে রক্ষা করতে কৌশলগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এই সফল লাইভ অপারেশন তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে ইসরাইলের মাটিতে শত শত মার্কিন সেনাসদস্য সক্রিয়ভাবে মোতায়েন রয়েছেন। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, এই সেনাসদস্যদের মধ্যে একটি বড় অংশ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধবিরতি ও মানবিক করিডোর পর্যবেক্ষণের জন্য গঠিত বিশেষ বহুজাতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছেন। আর বাকি অংশটি ইসরাইলের আকাশসীমা সুরক্ষায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যকলাপে (যেমন থাড ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম) সরাসরি কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছেন।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দেওয়া তথ্যমতে, ইরান এই দফায় ইসরাইলকে লক্ষ্য করে প্রায় ৩০টি দূরপাল্লার নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। একই সময়ে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্ত উত্তপ্ত থাকার পাশাপাশি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলকে লক্ষ্য করে আরও দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও উস্কে দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের এই যুদ্ধকালীন সংঘাতসহ গত দুই বছরের মধ্যে এই নিয়ে মোট তৃতীয়বারের মতো ইরানের বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে ইসরাইলকে রক্ষায় সরাসরি মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের ঘটনা ঘটল:
১. এপ্রিল ২০২৪ (প্রথম সরাসরি হামলা): ইসরাইলি ভূখণ্ডে ইরানের ইতিহাসের প্রথম সরাসরি ও নজিরবিহীন হামলায় মার্কিন বাহিনী ৩০০টিরও বেশি আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় মার্কিন ফাইটার এয়ারক্রাফট ও যুদ্ধজাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই প্রায় সব আকাশযান ধ্বংস করে দেয়।
২. মে-নভেম্বর ২০২৪ (দ্বিতীয় হামলা): ২০২৪ সালের শেষের দিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের আরেকটি বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
৩. জুন ২০২৬ (চলতি সপ্তাহের হামলা): ইরান ও ইয়েমেনের হুথিদের যৌথভাবে ছোড়া ৩০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ মধ্য-আকাশেই ধ্বংস করে দেয় মার্কিন নৌ ও স্থলবাহিনী।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও চোখধাঁধানো সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের উন্নত ফাইটার জেট, বিমানবাহী রণতরী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার), পারমাণবিক সাবমেরিন এবং প্রায় ৫০,০০০-এরও বেশি নিয়মিত সেনা। মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই অঞ্চলের মার্কিন স্বার্থ ও কূটনীতিকদের রক্ষা করার পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে থাকা আঞ্চলিক মিত্রদের (বিশেষ করে ইসরাইল) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই বিপুল সামরিক বিন্যাস বজায় রাখা হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহের এই অভিযানে ঠিক কোন কোন যুদ্ধজাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, তার গোপনীয় ও কৌশলগত বিবরণ এখনও প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।
মন্তব্য করুন