পানামায় ৭.৫ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ৭৪৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ চ্যুতির নড়াচড়া, দ্বীপ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার খবর ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের বিস্তারিত জানুন।
মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় ৭.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর থেকে অঞ্চলে একের পর এক অনুকম্পন বা পরাঘাত (আফটারশক) অনুভূত হয়ে চলেছে। এখন পর্যন্ত সেখানে মোট ৭৪৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ চরম অস্থিতিশীলতার কারণে ভূতত্ত্ববিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পানামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্তর লুকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লা প্রেসাককে জানান যে, তাত্ত্বিক ধারণা এবং অতীতের ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুযায়ী এত শক্তিশালী ভূ-কম্পনের পর পরবর্তী এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত আফটারশক অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভূ-কম্পনটির কেন্দ্রস্থল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটারের কম গভীরে হওয়ায় প্রচুর শক্তি নির্গত হয়েছে। ফলে ভূত্বকের ভেতরের বিভিন্ন অংশ এখনো নিজেদের টেকটোনিক অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আফটারশকগুলোর তীব্রতা বা মাত্রা সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে কমে আসছে।
ভূমিকম্পের ফলে তৈরি হওয়া শক্তির প্রভাবে ভূগর্ভস্থ চ্যুতির (ফল্ট লাইন) অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা দিয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের জমি উঁচু হয়ে যাওয়া কিংবা নিচে দেবে যাওয়ার মতো বড় ধরনের ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। গবেষকরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরেজমিনে পরিদর্শন শুরু করেছেন যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় এসব পরিবর্তন ফল্ট লাইনের গতিবিধির কারণেই ঘটছে কি না। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানি খনিজ পদার্থের সংস্পর্শে আসার কারণে কয়েকটি অঞ্চলের পানির রং পরিবর্তন হয়ে ধূসর রূপ ধারণ করার খবর পাওয়া গেছে, যা রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে পানামার দক্ষিণাঞ্চলীয় লস সান্তোস প্রদেশের ইসলা কানাস দ্বীপে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন যে ভূমিকম্পের পর দ্বীপটি মাঝখান থেকে দুই ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদদের একটি দল দ্বীপজুড়ে কোনো বড় ফাটল তৈরি হয়ে তা সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। এই ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে তা ভূগর্ভস্থ চ্যুতির বড় নড়াচড়ার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে, যদিও দ্বীপটি সত্যিই দ্বিখণ্ডিত হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট দেশটির ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবসস্থাকে আরও উন্নত করার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে অন্তত ১৫০টি আধুনিক ভূমিকম্প মাপক যন্ত্র এবং ৭০০টির মতো আগাম সতর্কীকরণ সেন্সর প্রয়োজন। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ ও গবেষক দলগুলো সমগ্র পানামা জুড়ে ভূ-কম্পনজনিত প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।