ফুটবল ও কার্নিভালের দেশ হিসেবে পরিচিত ব্রাজিলের পর্দার আড়ালে রয়েছে ইসলামের এক দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর অথচ গৌরবময় ইতিহাস। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে আজ যারা শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক নেতৃত্বে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের পূর্বপুরুষদের পথচলা ছিল সংগ্রাম, দাসত্ব এবং ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ব্রাজিলে ইসলামের সূচনা ও দাসত্বের ইতিহাস ব্রাজিলের মাটিতে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল পর্তুগিজ নাবিকদের হাত ধরে। ১৬শ শতাব্দীর শুরুতে পেদ্রো আলভারেস কারব্যালের সাথে আসা মুসলিম নাবিকদের মাধ্যমে ইসলামের পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। তবে ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় হলো আফ্রিকান মুসলমানদের দাস হিসেবে ব্রাজিলে নিয়ে আসা। পর্তুগিজ শাসনামলে তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।
ঈমান ও স্বাধীনতার লড়াই চরম বৈরী পরিবেশেও মুসলিম দাসরা তাদের ঈমান ও ধর্মীয় পরিচয় বিসর্জন দেননি। তারা গোপনে আরবি ভাষায় কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ধরে রাখতেন। ১৬০৫ সালে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের আলমিরস এলাকায় জানজা জুম্বার নেতৃত্বে প্রায় ৩০ হাজার মুসলিম দাস বিদ্রোহ করে একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও ১৬৯৪ সালে পর্তুগিজ বাহিনীর কাছে সেই রাজ্যের পতন ঘটে, তবুও তাদের এই আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
নতুন যুগের সূচনা ও অভিবাসন ১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে লেবানন, ফিলিস্তিন, মিসর ও সিরিয়া থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রচুর মুসলিম অভিবাসী ব্রাজিলে আশ্রয় নেন। এই নতুন অভিবাসন ব্রাজিলের মুসলিম সমাজকে নতুন শক্তি জোগায় এবং দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন।
বর্তমানে ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ আজ ব্রাজিলে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান বসবাস করছেন। দেশটির প্রতিটি বড় শহরেই এখন মসজিদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় ১৩০টি মসজিদ রয়েছে, যা গত দুই দশকে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাও পাওলো, রিও ডি জেনিরো এবং রিও গ্রান্দে দো সুল অঞ্চলে মুসলিমদের শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে উঠেছে।
শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আজ ব্রাজিলের মুসলমানরা একটি সম্মানিত ও অগ্রসর সম্প্রদায়। তাদের প্রতিষ্ঠিত মক্তব, মাদ্রাসা এবং ইসলামিক স্কুলগুলো তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করছে।
ব্রাজিলের মুসলমানদের এই ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গল্প নয়, এটি প্রমাণ করে যে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং অটুট বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিকূলতার অন্ধকার ভেদ করেও কীভাবে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মন্তব্য করুন