বিশ্বখ্যাত ল্যুভর জাদুঘরে আলোচিত চুরির পর নিরাপত্তার বড় ফাঁক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক শিল্পকর্ম চোর অক্টাভ ডারহাম। সুযোগ পেলে ল্যুভরের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি তাঁর।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ও বিখ্যাত শিল্পকলা জাদুঘর ফ্রান্সের ল্যুভরে ঘটে যাওয়া শতাব্দীর আলোচিত ডাকাতির এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক থামেনি। তবে এবার ল্যুভরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় বড় ফাঁক ও গলদ নিয়ে প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি নিজেও একসময় ছিলেন অপরাধজগতের দুর্ধর্ষ শিল্পকর্ম চোর। ‘ডাচ লুপিন’ নামে পরিচিত ডাচ নাগরিক অক্টাভ ডারহাম দাবি করেছেন, ফ্রান্সে গত বছরের সেই চাঞ্চল্যকর চুরির পরও ল্যুভরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা রয়ে গেছে। তিনি খোলামেলা প্রশ্ন তুলেছেন, ল্যুভর কর্তৃপক্ষ তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত করার দায়িত্ব তাঁর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে কেন সোপর্দ করছে না?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৫৩ বছর বয়সি এই সাবেক শিল্পকর্ম চোরের চাঞ্চল্যকর সাক্ষাত্কার। বর্তমানে নিজেকে অপরাধজগত থেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে নেওয়ার দাবি করা ডারহাম নেটফ্লিক্সের বিখ্যাত ধারাবাহিক ফরাসি চরিত্র ওমর সি অভিনীত ভদ্রবেশী চোর ‘লুপিন’-এর অনুসরণে নিজেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডাচ লুপিন’ হিসেবে পরিচয় দেন। নিজের চুরির অতীত নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত নন এই সাবেক অপরাধী। তিনি জানান, ক্যারিয়ারে ব্যাংক, আন্তর্জাতিক সেফ ডিপোজিট ভল্ট ও সাঁজোয়া গাড়ি থেকে শুরু করে মানুষের ধারণার বাইরে থাকা সব মূল্যবান বস্তু চুরি করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০০২ সালে আমস্টারডামের বিখ্যাত ভ্যান গঘ জাদুঘরের নিরাপত্তা ভেঙে দুটি বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম চুরি করে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেন, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
অপরাধের জীবন থেকে অবসর নিলেও চুরি যাওয়া অমূল্য শিল্পকর্মগুলোর প্রতি ডারহামের আগ্রহ এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি। তবে এখন তাঁর লক্ষ্য চুরি করা নয়, বরং অপরাধজগতের পুরোনো গোপন যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে চুরি যাওয়া অমূল্য শিল্পকর্মগুলো উদ্ধার করা। মজার বিষয় হলো, কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক ছাড়াই কেবল আনন্দের তাগিদে এই উদ্ধার কাজ পরিচালনা করেন তিনি। নিজেকে পুলিশের তথ্যদাতা বা ‘ইনফর্মার’ বলতে ঘোর আপত্তি জানিয়ে ডারহাম বলেন, তিনি কোনো গোপন তথ্যদাতা নন, বরং পুলিশ ও চোরদের মধ্যবর্তী একটি নিরপেক্ষ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। বিশ্বজুড়ে ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ নামে খ্যাত ডাচ প্রখ্যাত শিল্পকর্ম অনুসন্ধানী আর্থার ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে ভ্যান গঘের চোর হওয়া বিখ্যাত ‘স্প্রিং গার্ডেন’ চিত্রকর্মসহ একাধিক প্রাচীন রেনেসাঁস শিল্পকর্ম উদ্ধারে বড় ভূমিকা রেখেছেন ডারহাম।
ইউরোপের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে দিনদুপুরে এমন দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত বছরের অক্টোবরে ল্যুভর জাদুঘরে দিনের আলোয় দুর্ধর্ষ চোরেরা ঢুকে নেপোলিয়ন আমলের অমূল্য রত্ন ও সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। ওই একই দিনে ফ্রান্সের অপর এক জাদুঘর থেকেও প্রায় এক লাখ ডলারের স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে ইউরোপজুড়ে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন জাদুঘর থেকে চিত্রকর্ম এবং মূল্যবান হীরার গহনা চুরির ঘটনা নিয়মিত সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইউরোপোলের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালানো অপরাধীরা আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি সহিংস, বেপরোয়া ও ইলেকট্রিক বৈপ্লবিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্ত্বেও ইউরোপের অধিকাংশ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরগুলোর ভবন শত শত বছরের পুরোনো হওয়ায় ব্যাংকের মতো আধুনিক সুরক্ষিত দুর্গ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাচের সামান্য বাক্স কিংবা একজন সাধারণ নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া মূল্যবান শিল্পের সামনে আর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে না। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চোরেরা হাতুড়ি, সাবল ও ব্যাটারিচালিত আধুনিক কাটার ব্যবহার করায় খুব সহজেই তিন মিনিটের কম সময়ে চুরি সম্পন্ন করে কেটে পড়তে পারছে। তবে প্রাচীন এসব চিত্রকর্ম চুরি করা যত সহজ, বর্তমান ডিজিটাল নজরদারির যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে তা বিক্রি করা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন ও দুঃসাধ্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এর মধ্যেই ল্যুভর জাদুঘরের নিরাপত্তায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে ডারহাম জানিয়েছেন, সম্প্রতি ল্যুভর পরিদর্শনে গিয়ে তিনি ভবনের পাশের একাধিক জানালায় বড় ধরনের ফাটল দেখতে পেয়েছেন। মূল প্রবেশদ্বারে নতুন করে বেড়া দেওয়া হলেও পাশের জানালাগুলোর অবস্থা এখনও আগের মতোই অরক্ষিত রাখা হয়েছে। ল্যুভর কর্তৃপক্ষ তাঁর দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও সাবেক এই দুর্ধর্ষ চোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ যদি তাকে পরামর্শক হিসেবে সুযোগ দেয়, তবে তিনি এখনও প্রমাণ করে দিতে প্রস্তুত যে কত সহজে ল্যুভরের নিরাপত্তা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা যায়।