দক্ষिণা দিগন্তের বাতাস আর আমবাগানের ছায়ায় ঘেরা গ্রামবাংলাকে একসময় মাতিয়ে রাখত লোকসুর, যার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, পশ্চিমা সুরের দাপট আর অন্তহীন সামাজিকমাধ্যমের যুগে সেই গম্ভীরার সুর আজ যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। এই প্রতিকূলতার মাঝেও বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে মঞ্চে ‘নাতি’ সেজে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতি ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে তুলে ধরে গম্ভীরাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ফাইজুর রহমান মানি। একাধারে লোকসংস্কূতিকর্মী, সংগঠক ও স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান হিসেবে পরিচিত এই মানুষটির জীবন কেবল শিল্পের সাধনা নয়, বরং এক নিঃসঙ্গ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের গল্প।
ছাত্রজীবনে কাব, স্কাউট ও রোভার স্কাউটসের সুবাদে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার মাধ্যমেই গম্ভীরার সঙ্গে মানির পরিচয় ঘটে। তবে ১৯৯৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের হরিমোহন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনে ভিন্নধর্মী এক গম্ভীরা পরিবেশন করে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। এরপর ১৯৯৮ সালে ইউনিসেফ ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সচেতনতামূলক গম্ভীরা আয়োজনের মাধ্যমে তিনি পুরোদস্তুর পেশাদার লোকশিল্পীতে পরিণত হন। পরবর্তীতে নিজ জেলার পরিচয় তুলে ধরতে তিনি গড়ে তোলেন ‘চাঁপাই গম্ভীরা’ নামের দল, যা বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’সহ দেশের নানা বড় আয়োজনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে এই শিল্পে দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখের নয় বলে জানান মানি। তার মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু সংস্কৃতির ওপর ভর করে সংসার চালানো অসম্ভব। ব্যান্ড শিল্পীদের পেছনে দেদারছে টাকা খরচ করা হলেও লোকশিল্পীদের পারিশ্রমিক অত্যন্ত নগণ্য এবং এর কোনো আর্থিক নিশ্চয়তা নেই। আর এই নির্মম বাস্তবতার কারণেই তিনি নিজের ছেলেকে গম্ভীরাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে নিষেধ করেছেন।
গম্ভীরার মূল শক্তি হলো যাকে নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ বা সমালোচনা করা হচ্ছে, তিনিও সামনে বসে হাসতে বাধ্য হন। কিন্তু বর্তমান সমাজে সমালোচনার সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ায় এবং অনেক শিল্পী গম্ভীরাকে কেবল সস্তা কৌতুক বা স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে রূপ দেওয়ায় এর আসল রূপ আজ নষ্ট হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন মিউজিকের আগ্রাসন ও ইন্টারনেটের প্রভাবে গ্রামীণ যুবসমাজও লোকসংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জাতীয় বা সরকারি বড় আয়োজনে গম্ভীরার কদর থাকলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো গম্ভীরা শিল্পী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কিংবা শিল্পকলা একাডেমি পদকের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। নানা অবহেলা ও অনিশ্চয়তার পরও ফাইজুর রহমান মানি বিশ্বাস করেন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং মানুষের সচেতনতাই পারে বাংলার এই প্রাচীন ও শক্তিশালী লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে।
মন্তব্য করুন