আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেশ কিছু কঠোর শর্ত থেকে সরে আসছে সরকার। দেশের স্বার্থ এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বা আইএমএফের বেশ কিছু মৌলিক ও কঠোর শর্ত থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসছে বর্তমান সরকার। দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা এবং সুদের হার শিথিল না করার মতো শর্তগুলো এখন আর কঠোরভাবে মানছে না প্রশাসন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের দাম বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমানোর শর্ত বাস্তবায়নেও জোরালো কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভের সঠিক হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতের পাহাড়সমান খেলাপি ঋণ কমানোর মতো বিষয়গুলোও সময়মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো এসব শর্তের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে বেশ কিছু জনবান্ধব ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো ধরনের শর্ত মেনে আইএমএফের সঙ্গে কোনো ঋণচুক্তি করবে না সরকার।
নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আইএমএফের কাছে নতুন করে ঋণ সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় এবং পূর্বের চুক্তিটি বাতিল করে নতুন চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত জুলাই মাসে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে দেশের সার্বিক অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। এই ডেটার ওপর ভিত্তি করে তারা একটি নতুন প্রতিবেদন তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের নতুন ঋণের জন্য নতুন কিছু শর্তের রূপরেখা দাঁড় করাবে। আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বার্ষিক সভার পার্শ্ববৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত ওই বৈঠকেই বাংলাদেশের নতুন ঋণ পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ নেবে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার যে চুক্তিটি করেছিল, বর্তমান সরকার এসে তা বাতিল করায় এখন সম্পূর্ণ নতুন একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশ। যদিও আইএমএফের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আগের কোনো ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকলে শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে, তবুও বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে দেশের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া।
আইএমএফের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ডলারের বিনিময়মূল্য সম্পূর্ণভাবে বাজারের মুক্ত ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন কোনোভাবেই এতে হস্তক্ষেপ না করে। তবে বাজারে কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা রোধ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই শর্ত পুরোপুরি মানেনি। আগস্টের শুরুর দিকে ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করলে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে সর্বোচ্চ দর নির্দিষ্ট করে দিয়ে বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়, যার ফলে পরবর্তীতে ডলারের দাম কিছুটা কমে আসে। এছাড়া, মূল্যস্ফীতি সহনীয় না হওয়া পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার শর্তের ক্ষেত্রেও কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে সম্প্রতি নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি ঋণের সুদহার কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ফিরে আসে।
জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং কৃষিপণ্যের প্রধান উপাদান সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে দফায় দফায় বাড়ানোর যে শর্ত আইএমএফ দিয়েছিল, তা থেকেও সরকার পিছু হটছে। কারণ এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা হলে সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে। একইভাবে বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে আনার শর্তের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কঠোর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন দায় বাদ দিয়ে নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ কমানোর প্রক্রিয়াও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। উল্টো বিগত সরকারের আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং জনস্বার্থ বজায় রাখতে আইএমএফের গতানুগতিক ও কঠোর শর্তের বাইরে এসে নিজস্ব কৌশলে এগোচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাত।