২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে স্পেন। আর এই ঐতিহাসিক জয়ের ঠিক পরেই আসরের সেরা খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ উঠেছে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রির হাতে। ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা ফুটবলারের হাতে পুরস্কারটি ওঠার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, গোল এবং অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের দিক থেকে রদ্রির চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভ্রোমরা লিওনেল মেসি।
এবারের আসরে ৩৯ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফর্মে থেকে মেসি মোট ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তার জাদুকরী পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই আর্জেন্টিনা ফাইনালে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের সুসংগঠিত ও জমাট মিডফিল্ডের সামনে মেসি তার স্বাভাবিক খেলা উপহার দিতে ব্যর্থ হন। স্প্যানিশ রক্ষণ ও মাঝমাঠের দারুণ ট্যাকটিক্সের কারণে পুরো ম্যাচ জুড়েই আক্রমণভাগে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা।
এর বিপরীতে, স্পেনের পুরো টুর্নামেন্ট ও ফাইনাল ম্যাচের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রদ্রি। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে তার প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব ছিল দলের মাঝমাঠকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা, মাঠের দখল নিজের পায়ে রাখা, ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। যদিও তার নামের পাশে বড় কোনো গোল কিংবা অ্যাসিস্টের ঝলক ছিল না, তবে মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে তার বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতিই স্পেনের মাঝমাঠের স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।
বিশেষ করে এবারের বিশ্বকাপের কঠিন সব নকআউট পর্বে পর্তুগাল, ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বমানের দলগুলোর বিপক্ষে মাঝমাঠের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন রদ্রি। তার নিপুণ নেতৃত্ব এবং নিখুঁত পাসিংয়ের দক্ষতায় পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে নিজেদের খেলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল লুইস ডি লা ফুয়েনের দল।
রদ্রির এই অসামান্য অর্জন তাকে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অতি বিরল ও বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে ফরওয়ার্ড বা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা এই পুরস্কার এর আগে খুব কম ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা গোলরক্ষকই জিততে পেরেছেন। অতীতে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন কেবল ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ (২০১৮), ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান (২০০৬) এবং জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক অলিভার কান (২০০২)।
এবারের আসরে গোল করার দিক থেকে লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে আলোচনার শীর্ষে থাকলেও ফিফার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনের মানদণ্ড কেবল গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। বরং কোনো ফুটবলারের দলের ওপর সামগ্রিক প্রভাব, কৌশলগত গুরুত্ব, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিকতা এবং ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার অনন্য অবদানকেই সর্বাধিক মূল্যায়ন করা হয়। আর এই সমস্ত ট্যাকটিক্যাল ও পারফরম্যান্সের মাপকাঠিতে রদ্রির অতুলনীয় অবদানই তাকে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলের সবচেয়ে যোগ্য ও যৌক্তিক দাবিদার করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন