ভিনিসিউস জুনিয়র যে বিশ্বমানের একজন ফুটবলার, সেই তথ্য ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নতুন কিছু নয়। গত তিন মৌসুম ধরে ব্যালান ডি’অরের লড়াইয়ে শীর্ষ তালিকায় থাকা এই তারকা রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে বার্সেলোনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে গোল করে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। তবে রিয়ালের সেই চেনা ভিনি যখনই ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে জড়াতেন, তখনই যেন তাঁর পারফরম্যান্স হয়ে যেত অচেনা। ১ বছর আগেও জাতীয় দলে তাঁর পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান ছিল হতাশাজনক ও অস্বস্তির। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের ডাগআউটে আসার পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। আনচেলত্তির জাদুকরী আস্থার হাত ধরে ভিনিসিউস এখন সেলেসাওদের ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের মূল নিউক্লিয়াস হয়ে উঠেছেন।
অতীতে ব্রাজিলের জার্সিতে ভিনির পারফরম্যান্স তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করতে পারছিল না:
আগের পরিসংখ্যান: জাতীয় দলের হয়ে প্রথম ৩৯ ম্যাচে তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১টি, যেখানে প্রতি ম্যাচে অবদান ছিল গড়ে মাত্র ০.২৮।
মানসিক চাপ: ক্লাবে প্রমাণিত সৈনিক হলেও জাতীয় দলের হয়ে এই শ্লথ গতি ভিনির ওপর পাহাড়সম মানসিক চাপ ও হতাশা তৈরি করেছিল।
আনচেলত্তি টনিক: রিয়াল মাদ্রিদে ভিনির আজকের তারকা হয়ে ওঠার পেছনে বড় অবদান ছিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির। সেই আনচেলত্তি ব্রাজিলের জাতীয় দলের কোচ হয়ে আসার পর তা ভিনির জন্য টনিক হিসেবে কাজ করে।
পরিসংখ্যানের জাদুকরী রূপান্তর: আনচেলত্তির অধীনে মাত্র ১২ ম্যাচে ৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন ভিনি, যার মধ্যে রয়েছে ৫টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট। এর ফলে তাঁর গোল-অ্যাসিস্টের গড় ০.৩-এর নিচ থেকে একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৭৫-এ, যা প্রায় ১৬৭ শতাংশের অবিশ্বাস্য উন্নতি!
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে নিজের চেনা ছন্দ ফিরে পেয়েছেন ভিনিসিউস:
কিংবদন্তির পাশে ভিনি: বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদিনিওর সমান ৩টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্টের অবদান এখন ভিনির নামের পাশে।
হাইতি ম্যাচে জয়: সর্বশেষ ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে নিজে গোল করে এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়ে দলকে বিশ্বকাপের প্রথম জয় এনে দিয়েছেন তিনি।
২০২২-এর স্মৃতি ও ঘুরে দাঁড়ানো: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ার পর নিজের যোগ্যতা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পরবর্তী যুগে রিয়ালকে ২টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো এই তারকা এবার মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সব সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন。
ম্যাচ শেষে ভিনিসিউস জুনিয়র কিছুটা স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, ‘আমি জানি আমার গুরুত্ব কতটা। আমি যদি ভালো খেলি, জানি কতটা অবদান রাখতে পারি’। এটি কোনো অহংকার নয়, বরং নিজের ভেতরের সংশয় কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার গল্প। আনচেলত্তি কোনো জাদুমন্ত্র বলে নয়, বরং এক শান্ত ও নিরাসক্ত বিশ্বাসের জোরে ভিনিকে তাঁর স্বাভাবিক খেলাটা খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
আগামী বুধবার মিয়ামিতে স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’-তে দ্বিতীয় রাউন্ডের বা নকআউটের টিকিট নির্ধারণ হবে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির মাধ্যমে। তবে গ্রুপ পর্বের সমীকরণ যাই হোক না কেন, ভিনির খেলার এই নতুন রূপ ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মনে বহু বছরের পুরোনো ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্নকে আবারও নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। আর সে স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এই বদলে যাওয়া ভিনিই।
মন্তব্য করুন