ষষ্ঠীর বোধন শেষে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী। জানুন নবপত্রিকা স্নান, মহাস্নান এবং মহাসপ্তমীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য।
ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা পর্ব শেষে আজ দেশজুড়ে উৎসবমুখর ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। সকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাক-কাঁসরের বাদ্য, ধূপের সুবাস, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভক্তরা মন্দিরে মন্দিরে সমবেত হয়ে অঞ্জলি দান ও দেবী দর্শনে অংশ নিচ্ছেন। কেবল ধর্মীয় রীতিনীতির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, মহাসপ্তমীর মূল বার্তা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জাগরণ, প্রকৃতিকে রক্ষা করার অঙ্গীকার এবং সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান ও বর্ণাঢ্য আচার হলো ‘নবপত্রিকা’ বা প্রচলিত ভাষায় ‘কলাবউ’ স্নান ও স্থাপন। ৯টি উদ্ভিদ যেমন কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়িতে ভূষিত করে দেবী প্রতিমার পাশে স্থাপন করা হয়। শাস্ত্র মতে, এই নয়টি উদ্ভিদ হলো ব্রহ্মাণী, কালিকা ও উমাসহ দেবীর নয়টি বিশেষ মহাশক্তির রূপক। যদিও পূজামণ্ডপের কেন্দ্রে থাকে দেবী দুর্গার মৃণ্ময়ী প্রতিমা, তবুও মহাসপ্তমীতে সরাসরি প্রকৃতির অংশ গাছপালাকে পূজার মূল আচার বানানো প্রকৃতির প্রতি মানবজাতির পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনুপম নিদর্শন।
সপ্তমীর অপর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো দেবীর ‘মহাস্নান’। দর্পণে দেবীর প্রতিবিম্ব ফেলে গঙ্গার জল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাদানে দেবীকে স্নান করানো হয়, যা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আত্মিক বিশুদ্ধতাকে নির্দেশ করে। শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্নান প্রতিটি মানুষকে বার্তা দেয় যে, অহংকার, হিংসা ও বৈষম্য হৃদয়ে পুষে রেখে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় প্রকৃত ধর্ম পালন সম্পন্ন হয় না। সমাজে অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা জাগ্রত হওয়াই হলো আধ্যাত্মিকতার আসল সামাজিক রূপ।
পৌরাণিক কাহিনীতে মহিষাসুর বধের ঘটনাটি শুভ ও অশুভ শক্তির চিরন্তন দ্বন্দ্বে সত্যের জয়কেই ফুটিয়ে তোলে। দেবীর দশ হাতের দশটি অস্ত্র মূলত অশুভ ও অন্যায় প্রতিরোধ করার সামর্থ্যকে নির্দেশ করে। দেবীর পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করেন, যার রূপক অর্থ হলো জ্ঞান ছাড়া ধন-সম্পদ অন্ধ এবং সাহস ও বুদ্ধি ছাড়া শক্তির সঠিক প্রয়োগ অসম্ভব। একই সাথে বাঙালি সংস্কৃতিতে দেবীর এই আগমনকে স্বর্গ থেকে কন্যাসন্তানের পিতৃগৃহে ফিরে আসার এক সুগভীর পারিবারিক আবেগ হিসেবেও দেখা হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষের সমাগমে এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। মহাসপ্তমীর প্রধান শিক্ষাই হলো ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া। উৎসবের পূর্ণ আনন্দ তখনই রূপ পায় যখন সবাই ভয়হীন পরিবেশে নিজ নিজ সংস্কৃতি পালন করতে পারে। এই ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে গেলেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিকতা, পরিবেশ রক্ষা করা এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা যেন নাগরিক জীবনে সবসময় বজায় থাকে, এটিই মহাসপ্তমীর প্রধান অঙ্গীকার।