ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের নতুন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতা বা প্রধান হিসেবে খলিল আল-হাইয়ার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরাইলের একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এবং আঞ্চলিক শক্তি ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার সুবাদে তিনি বর্তমানে হামাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক নেতা হিসেবে পরিচিত।
চৌষট্টি বছর বয়সি খলিল আল-হাইয়া বর্তমানে ফিলিস্তিনের গাজার বাইরে কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে তাঁকে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে। চলমান গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলি সামরিক হামলায় তার এক ছেলে নির্মমভাবে নিহত হন। এর আগে ইসরাইলের সঙ্গে আগের বিভিন্ন বড় সংঘাতেও তিনি আরও দুই ছেলেকে হারিয়েছেন। ইতিহাসের ভয়াবহতম ব্যক্তিগত ক্ষতি ও স্বজন হারানোর গভীর বেদনা বুকে নিয়েও তিনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
ইসরাইলের আকস্মিক ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একের পর এক প্রাণ হারানোর পর সংগঠনের ভেতরে আল-হাইয়ার রাজনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সাবেক রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থানরত হামাস নেতাদের মধ্যে তাকেই সবচেয়ে প্রভাবশালী ও যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর পর কাতারভিত্তিক পাঁচ সদস্যের যে নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছিল, আল-হাইয়া তার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন।
১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠার সূলগ্ন থেকেই এই আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন গাজার মূল নিবাসী খলিল আল-হাইয়া। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অপরাধে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করেছিল। ২০০৭ সালে গাজা সিটির শেজাইয়া এলাকায় তার নিজস্ব বাসভবনে ইসরাইলি বিমান হামলায় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান। পরবর্তীতে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের রক্তক্ষয়ী গাজা যুদ্ধের সময়ও বিমান হামলায় তার বড় ছেলে ওসামা, ওসামার স্ত্রী এবং তাদের তিন সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নিহত হন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা ও জীবনের ঝুঁকি এড়াতে কয়েক বছর আগে আল-হাইয়া গাজা ছেড়ে কাতারে পাড়ি জমান। এরপর থেকেই আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হামাসের প্রধান কূটনৈতিক দূতের ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি গাজা যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় সংক্রান্ত জটিল আলোচনাগুলোতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলী ভূমিকা পালন করেন। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার আলোচনাতেও তিনি হামাসের প্রধান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়ার সঙ্গে তিনি তেহরান সফর করেছিলেন, যা ইরানের সঙ্গে হামাসের গভীর সামরিক ও কূটনৈতিক বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি সামলানো এবং চরম সংকটময় মুহূর্তে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে খলিল আল-হাইয়ার অভিজ্ঞতা হামাসের ভবিষ্যৎ পথচলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মন্তব্য করুন