বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টেসলা তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের স্পোর্টস কার ‘রোডস্টার’-এর এক নতুন সংস্করণ উন্মোচন করেছে। রকেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের তৈরি বিশেষ থ্রাস্টার প্রযুক্তির সহায়তায় এই শক্তিশালী স্পোর্টস কারটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শূন্যে উড়তে, বাতাসে ঘুরে যেতে এবং নিরাপদে মাটিতে ল্যান্ড করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ম্যাকগ্রেগরে অবস্থিত স্পেসএক্সের রকেট টেস্টিং ফ্যাসিলিটিতে অনুষ্ঠিত এক জমকালো প্রদর্শনীতে গাড়িটি উন্মোচন করা হয়। ডেমো চলাকালে প্রোটোটাইপ রোডস্টারটি একটি বাঁকানো র্যাম্প বেয়ে উঠে সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থায় চলতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে শূন্যে উৎক্ষেপণ করে শূন্যেই ঘূর্ণন সম্পন্ন করে মাটিতে সফলভাবে অবতরণ করে। অন্য একটি চমকপ্রদ প্রদর্শনীতে এটি সাইবারট্রাক, টেসলা সেমি এবং মডেল ওয়াই-এর মতো টেসলার সারিবদ্ধ অন্যান্য গাড়ির ওপর দিয়ে শূন্যে লাফিয়ে পার হয়।
গাড়িটির বাতাসে ওড়ার চমৎকার এই ক্ষমতা এসেছে মূলত একটি শক্তিশালী প্রোপালশন সিস্টেম থেকে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী রকেট জ্বালানির বদলে অত্যন্ত উচ্চ চাপে সংরক্ষিত গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও টেসলা এখনো পর্যন্ত আকাশপথে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সুবিধা প্রদর্শন করেনি, তবে এই স্পেসএক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে যানটি শূন্যে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বিভিন্ন চমকপ্রদ কসরত করতে সক্ষম।
উন্মোচন অনুষ্ঠানে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক জানান, রোডস্টারে বিশেষ অ্যালটিটিউড-কন্ট্রোল থ্রাস্টার এবং পেছনের অংশে মেইন থ্রাস্টার যুক্ত করা হয়েছে, যা গাড়িটিকে শূন্যে নানা ধরনের কসরত করার সক্ষমতা দেয়। এই পুরো ব্যবস্থাটি অ্যারোস্পেস কোম্পানি স্পেসএক্সের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণে ডিজাইন করা হয়েছে।
গাড়ির কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে টেসলা জানিয়েছে, রোডস্টারে ব্যবহৃত কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টারগুলো নোজেলের মাধ্যমে উচ্চ চাপে সংরক্ষিত গ্যাস (মূলত নাইট্রোজেন) নির্গত করে শক্তিশালী থ্রাস্ট উৎপন্ন করে। গ্যাসটি হালকা কিন্তু চরম চাপ সহ্য করতে সক্ষম কম্পোজিট-ওভারর্যাপড প্রেশার ভেসেল কন্টেইনারে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়। এটি সাধারণ রকেট ইঞ্জিনের মতো জ্বালানি না পুড়িয়ে সংরক্ষিত গ্যাস দ্রুত বাইরে বের করে দিয়ে বিক্রিয়া বল তৈরি করে, যা গাড়িকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তবে সীমিত পরিমাণ গ্যাস থাকার কারণে দীর্ঘ ফ্লাইটের বদলে এটি স্বল্প সময়ের কসরতের উপযোগী।
শূন্যে ওড়ার পাশাপাশি গাড়িটির আরও একটি অবিশ্বাস্য ড্রাইভিং ক্ষমতা দেখানো হয়েছে। একটি বিশেষ র্যাম্পে গাড়িটি পুরো উল্টো হয়ে ড্রাইভ করে। টেসলার ভেহিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রধান লার্স মোরাভি জানান, গাড়ির নিচের অংশে যুক্ত ফ্যান-ভিত্তিক সাকশন সিস্টেম টানা দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সমান সাকশন তৈরি করতে পারে, যা উল্টো ট্র্যাকেও গাড়িটিকে শক্ত করে আটকে রাখে।
নতুন এই রোডস্টারের তিনটি সংস্করণ আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে টেসলা: পারফর্ম্যান্স, থ্রাস্ট এবং রকেট ভার্সন। এর মধ্যে পারফর্ম্যান্স সংস্করণটি স্বাভাবিক রাস্তায় চলাচলের জন্য, থ্রাস্ট সংস্করণে পেছনে কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার যুক্ত থাকবে এবং রকেট সংস্করণটি পুরোপুরি শূন্যে কসরত করার উপযোগী ১০টি থ্রাস্টার সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে।
স্পেসিফিকেশনের দিক থেকে, পারফর্ম্যান্স ভার্সন মাত্র ১.৬ সেকেন্ডে ০ থেকে ৬০ মাইল গতি তুলতে পারবে। অন্যদিকে থ্রাস্ট ভার্সন ০.৯ সেকেন্ডে এবং রকেট ভার্সন মাত্র ০.৫৯ সেকেন্ডের কম সময়ে এই গতি অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে দাবি টেসলার। গাড়িটির সর্বোচ্চ গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ২৩০ মাইলের বেশি এবং একবার চার্জে ৩০০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিতে পারবে।
তবে টেসলার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, রকেট সংস্করণটি কেবল বিশেষ আমন্ত্রণে সীমিত সংখ্যক গ্রাহকের জন্য থাকবে এবং সাধারণ পাবলিক রোডে এটি চালানোর অনুমোদন নেই। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টারের ধারণা দেওয়া হলেও বারবার বিলম্বের পর অবশেষে ২০২৮ সালে গাড়িটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মন্তব্য করুন