দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর মাধ্যমে নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’-এর কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এই বিশাল প্রকল্পটি দেশের দীর্ঘদিনের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে যুগান্তকারী এই মেগা প্রকল্পটিকে ঘিরে পাবনার রূপপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের তুমুল উচ্ছ্বাস রয়েছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ে বিরাজ করছে গভীর আতঙ্ক ও শঙ্কা।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন যে, এই বছরের শেষ নাগাদ কেন্দ্রটির প্রথম রিয়্যাক্টর চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এর ঠিক এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটটিও পুরোপুরি কার্যকর হবে। প্রকল্পটির দুটি ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে তা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে দারুণ অবদান রাখবে। রূপপুরকে কেন্দ্র করে এককালের নিভৃত এই জনপদ এখন একটি প্রাণবন্ত ও আন্তর্জাতিক এলাকায় রূপ নিয়েছে। স্থানীয় দোকানপাট ও রেস্তোরাঁগুলোর সাইনবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি রুশ ভাষার ব্যবহার এবং ঐতিহ্যবাহী ‘বর্শ’ সুপের সমাহার এক ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।
প্রকল্পের সুবাদে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বহু মানুষ পুরনো পেশা ছেড়ে এই কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছেন। রাশিয়ার অনেক প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান সপরিবারে রূপপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন, যা স্থানীয়দের সঙ্গে এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং অনেকেই প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে এই প্লান্টে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন।
তবে নানামুখী ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও স্থানীয়দের একটি বড় অংশের মধ্যে নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি বসবাসকারী প্রবীণ বাসিন্দারা ১৯৬০-এর দশকে পরিকল্পনা হওয়া এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক চুল্লী স্থাপন নিয়ে বহু আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি বিভিন্ন পরীক্ষার সময়কার বিকট শব্দ ও কম্পন স্থানীয় লোকজনের মনে ইউক্রেনের চেরনোবিল বা জাপানের ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও রূপপুর কর্তৃপক্ষ বারবারই জোরালোভাবে দাবি করে আসছে যে, আন্তর্জাতিক সমস্ত পরমাণু নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং পূর্বের বড় দুর্ঘটনাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সর্বাধুনিক ও নিরাপদ প্রযুক্তি এই প্রকল্পে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে কিছু শঙ্কা ও রাজনৈতিক বিতর্কের রেশ থাকলেও স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের কাছে প্রধান প্রত্যাশা হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তি। ১৯৬৫ সালে প্রাথমিক পরিকল্পনার পর বিগত দশকগুলোতে নানা কূটনৈতিক আলোচনা, চুক্তি এবং পরবর্তীতে কভিড মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকল্পটি বারবার বিলম্বিত হয়েছে। তবুও तमाम চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলতি বছরই দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে পদার্পণের চূড়ান্ত অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
মন্তব্য করুন