যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো চাপ ও হুমকির মুখে ইরান কখনোই মাথা নত করবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানে তেহরান যে আলোচনার জন্যও প্রস্তুত রয়েছে, সে কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট এই অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও হুমকি যত বেশি বৃদ্ধি পাবে, ইরানের বীর জনসাধারণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সংকল্প ঠিক ততটাই দৃঢ় হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, আমরা কখনোই মাথা নত করব না এবং কারো সামনে হাঁটু গেড়ে বসব না।
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, নতুন কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘দাদাগিরির মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। শক্তি প্রয়োগের ভাষা তেহরান কখনোই মেনে নেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার পথ আমাদের জন্য খোলা রয়েছে, কিন্তু তা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তের বিষয়ে পেজেশকিয়ান জানান, যেকোনো সমঝোতার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইরানের ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিতে হবে। বিশেষ করে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবাধ জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করাকে প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের সবাই হরমুজ প্রণালির অবাধ সুবিধা ভোগ করবে, অথচ নিজ ভূখণ্ডের দোরগোড়ায় আমাদের সেখানে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে না এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে পেজেশকিয়ান জানান, তেহরান কখনোই তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার থেকে একচুলও সরে দাঁড়াবে না। তবে দেশটি কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আগ্রহী নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। তাঁর ভাষায়, আমাদের লক্ষ্য পরমাণু অস্ত্র নয়, বরং শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির অধিকার যেখানে কোনো অযৌক্তিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
ভাষণের একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় নিহত সাধারণ নাগরিকদের বেশ কিছু ছবি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ইরানকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করছে, অথচ বাস্তব সত্য হলো আমরাই দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের মূল শিকার হয়ে আসছি।
এদিকে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে একটি পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন পক্ষ এই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক’ বলে অভিহিত করলেও, তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দকৃত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত না করা পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মন্তব্য করুন