আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে গুরুতর অভিযোগ ও আইনি জটিলতায় এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন এবং প্রকৃত দোষীদের বাদ দিয়ে তথ্য-প্রমাণ গোপনের অভিযোগ পুরো বিচারিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার একটি অডিও ফাঁস হওয়ার পর এই বিতর্ক চরম আকার ধারণ করে। ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে এবং বিচারের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ কেবল ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং অপরাধীদের রাজসাক্ষী বানিয়ে দায়মুক্তির অভিযোগও সামনে এসেছে। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তারা সাবেক পুলিশ প্রধান আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় অভিযুক্ত এসআই আবজালুল হককে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে রাজসাক্ষী বানিয়েছেন। প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ নিজেই দাবি করেছেন যে, দাগি খুনিদের পালানোর সুযোগ করে দিতে এবং অর্থের বিনিময়ে আসামিদের তালিকা থেকে নাম কাটানোর একটি সিন্ডিকেট ট্রাইব্যুনালে সক্রিয় ছিল। এমনকি রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলাতেও সরাসরি জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন নিহতের পরিবার।
এদিকে বিচার প্রক্রিয়ার এই অসংগতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা অভিযোগ করেছেন যে, চাক্ষুষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রভাবশালী আসামিকে রাজসাক্ষী বানানোর নামে প্রকারান্তরে বিচারের নামে প্রহসন করা হয়েছে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে এই বেইমানি জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন চিফ প্রসিকিউটর গত ৫ আগস্টের পর থেকে ট্রাইব্যুনালের সকল কর্মকাণ্ডের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে রামপুরার একটি হত্যা মামলার রায় স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন ডিজিটাল প্রমাণ হাতে আসায় তদন্ত পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা মূলত হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাইমুম রেজার মতো বিতর্কিত প্রসিকিউটরদের পদত্যাগ এবং নতুন নেতৃত্বের আগমনে তদন্তের ত্রুটিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ ও জুলাই বিপ্লবের অংশীজনরা এখন তাকিয়ে আছেন যে, এই অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে কি না এবং দোষী প্রসিকিউটর ও অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা হয় কি না। এই বিচারের স্বচ্ছতার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।
মন্তব্য করুন