জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নির্বিচারে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এক ঐতিহাসিক আইনি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চার হেভিওয়েট আসামির বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য (সিএভি) অপেক্ষমাণ রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার (১০ জুন) রাষ্ট্র ও আসামি উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তি-তর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন পর্ব শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ বা সিএভি রাখার আদেশ দেন। এর ফলে যেকোনো দিন এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালের এই আদেশের বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের শুনানিতে উভয় পক্ষের যুক্তি ও প্রসিকিউশনের আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর মূল তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
আসামিদের বিবরণ ও বর্তমান অবস্থান: এই মামলার প্রধান ৪ আসামি হলেন—আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার শুরু থেকেই তারা সবাই পলাতক রয়েছেন।
হানিফের নির্দেশ ও আজগর আলীর বক্তব্য: প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতর্কে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে স্থানীয় নেতা আজগর আলীর দেওয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আদালতে পেশ করেন। যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, তাদের শীর্ষ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে—"যে কোনো উপায়ে বা যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমন করতে হবে।"
পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ: গত ১১ মে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলামের মাধ্যমে শুরু হওয়া রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কে দাবি করা হয়, কুষ্টিয়ায় ৬ জনের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। আসামিদের উসকানিমূলক বক্তব্য, নির্দেশনা এবং সাংগঠনিক ভূমিকার ধারাবাহিকতাতেই কুষ্টিয়ায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত হামলার অংশ।
ট্রাইব্যুনালে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। এরপর গত ৭ জুন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন দল আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন দাবি করে তাদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) প্রার্থনা করেন।
পরবর্তীতে ৮, ৯ এবং আজ ১০ জুন আসামিপক্ষের নিযুক্ত আইনজীবীদের (পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত বা নিয়োজিত কৌঁসুলি) যুক্তি-তর্ক খণ্ডন শেষ হলে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য নথিভুক্ত করেন। ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়া অঞ্চলের এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়াসহ সারা দেশের রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে এখন ব্যাপক আগ্রহ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মন্তব্য করুন