
ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে তৈরি হওয়া অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশের তরুণ ও ছাত্র সমাজের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত কমিটির ১০ম বৈঠকে দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা জানানো হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকের প্রধান আলোচনার বিষয়: বৈঠক শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের অতুলনীয় অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তরুণদের কল্যাণে জনবান্ধব সংবিধান রচনার সার্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই সনদের ৬(ক) ধারায় বর্ণিত ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ নীতিতে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়ে স্বাক্ষর করলেও একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও বিরোধী দলগুলো তা নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ আন্তরিক।
বৈঠকে মূলত যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়:
শিক্ষা ও চিকিৎসাকে সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী ও বীর যোদ্ধাদের পূর্ণ আইনি সুরক্ষা।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
যেসব সংগঠন অংশ নিয়েছে ও বয়কট করেছে: বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু ও জাকসুর প্রতিনিধিসহ মোট ৬২ জন ছাত্রনেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন উপস্থিত থেকে মতামত প্রদান করেন।
তবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন এই সভা বয়কট করেছে। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে সভায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে এ ধরনের মতবিনিময় দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না বলেই তাঁরা অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা: সভায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব: ডাকসুর প্রতিনিধি হেমা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় পাহাড়ি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ১টি সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ৪টি বিশেষ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন, যেখানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটাররা সরাসরি ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন।
জরুরি অবস্থা বাতিলের দাবি: সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সংবিধানে ‘জরুরি অবস্থা’ সংক্রান্ত বিধান সম্পূর্ণ বিলোপের প্রস্তাব দেয়। তাঁদের মতে, বিগত বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী সরকার এটিকে জনগণের ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার বানিয়েছিল। মূল ৭২-এর সংবিধানে জরুরি অবস্থার সুযোগ ছিল না, পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে তা যুক্ত করেছিলেন।
উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ: গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন