
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বেতন বৈষম্য দূরীকরণ ও নতুন মজুরি কাঠামোর দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা, ভাঙচুর রোধ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ফিরিয়ে আনতে মাঠে নেমেছেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমানসহ স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
রবিবার (১ নভেম্বর ২০২৬) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে মহাসড়ক অবরোধ, শিল্প কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুপুরের দিকে দলীয় সমর্থকদের নিয়ে সরাসরি রাজপথে নেমে আসেন এই সংসদ সদস্য।
সহিংসতা ও তাণ্ডবের চিত্র: স্থানীয় শ্রমিক, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকাল ৯টার দিকে বেতন বৈষম্যের প্রতিবাদে হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে আশপাশের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে যোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যায়।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা সফিপুর ও কোনাবাড়ী এলাকার একাধিক কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরে আন্দোলনকারীরা কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেন এবং চন্দ্রা মোড়ে অবস্থিত যমুনা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে ভাঙচুর চালান। সহিংসতা চলাকালে ট্রপিক্যাল গার্মেন্টসসংলগ্ন একটি বাণিজ্যিক মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের সামনে মহাসড়কে টহলরত পুলিশের একটি গাড়িতে সরাসরি অগ্নিসংযোগ করেন উত্তেজিত শ্রমিকরা।
এমপি ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতা: পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সাথে নিয়ে রাজপথে আসেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান। তিনিসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দ চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর ও মৌচাকসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে অবস্থান নেন। তারা হ্যান্ডমাইকে শ্রমিকদের শান্ত হওয়ার ও মহাসড়ক ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
উপস্থিত শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে এমপি মজিবুর রহমান বলেন, “শ্রমিক ভাইদের সকল যৌক্তিক দাবির প্রতি বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। আপনাদের বেতন পুনর্নির্ধারণে ইতোমধ্যে মজুরি কমিশন গঠন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুতরাং আপনারা দয়া করে শান্ত হয়ে মহাসড়ক থেকে সরে যান এবং পোশাক কারখানা ও দেশের সম্পদের ক্ষতি বা ভাঙচুর বন্ধ করুন।”
অন্যদিকে পোশাকশ্রমিক প্রতিনিধি রাজিয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি খাতে নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি ও স্কেল পুনর্নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু দেশের অর্থনীতি সচল রাখা পোশাকশ্রমিকদের বেলাতেই কেন বারবার এমন চরম বৈষম্য করা হবে?”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও যানবাহন চলাচল: অবরোধ ও সহিংসতার কারণে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) একাধিক টহল দল মো মোতায়েন করা হয়েছে।
নওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আলী খান জানান, “মহাসড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ফেরাতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। আইন হাতে তুলে নেওয়া ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে কাজ শুরু হয়েছে।”
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হওয়ায় এ ধরনের অস্থিরতা রপ্তানিমুখী বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলছে। দ্রুত মজুরি কাঠামোর বাস্তবায়ন ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এ সংকটের টেকসই অবসান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।