
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্যের মধ্যে রয়েছে গ্রেপ্তারের আগে শারীরিক নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু এবং গোলাগুলির মতো ঘটনা। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে পুলিশের বর্তমান আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করা হবে’ মর্মে দেওয়া একটি মন্তব্য নতুন করে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্নের ঝড় তুলেছে।
আইজিপির বিতর্কিত মন্তব্য ও ব্যাখ্যা: গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজারে একটি ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি আলী হোসেন ফকির মন্তব্য করেছিলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না।”
এই মন্তব্যের পর তুমুল সমালোচনার মুখে পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করা হয় যে, আইজিপির বক্তব্যের মূল তাৎপর্য ছিল আইনের সীমার মধ্যে থেকে পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তবে সমালোচকরা বলছেন, আইন ও সংবিধানের সঙ্গে এই বক্তব্য পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া: আইজিপির এ ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতে বর্তমান সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, “আন্তর্জাতিক আইনে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র বিষয়টি স্বীকৃত। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড সাধারণত ওপরমহলের নির্দেশ ছাড়া হয় না। আইজিপির বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি ভয়ংকর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যার দায় উচ্চপর্যায়ের দিকেও বর্তাবে।”
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান মনে করেন, অতীতের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারের এ বিষয়ে স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত।
বিশ্লেষক মো. শেখাবুর রহমান ও সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারও মনে করেন, পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে এ ধরনের স্পর্শকাতর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য সরকারের মানবাধিকার অবস্থান এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিভিন্ন মহলের তীব্র নিন্দা: টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকারের অনুমতি কখনোই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও একে আইনের চরম বরখেলাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এদিকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলেও এই নিয়ে অস্বস্তি দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য সঠিক নয় এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের বক্তব্য সরকারকে স্বস্তির বদলে অপ্রয়োজনীয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অতীত পরিসংখ্যান: মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চিত্র উদ্বেগজনক ছিল। আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে অন্তত ৩৮ জন এবং ২০২৪ সালে অন্তত ২১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ২ হাজার ৬৯৩ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।