
সৌরজগতের উৎপত্তি এবং পৃথিবীর মতো গ্রহগুলোতে প্রাণের স্পন্দন কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তার উত্তর খুঁজতে এক যুগান্তকারী মহাকাশ অভিযান চালাতে যাচ্ছে জাপান এরোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাকসা)। লাল গ্রহ মঙ্গলের অন্যতম ছোট উপগ্রহ ‘ফোবোস’ থেকে শিলা ও বালুর নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এই অভিযানটি সফল হলে এটিই হবে বিশ্বের প্রথম মিশন, যা সরাসরি মঙ্গল অঞ্চল থেকে কোনো বস্তুর ভৌগোলিক নমুনা সংগ্রহ করে সফলভাবে পৃথিবীতে অবতরণ করবে।
জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে শক্তিশালী এইচ-৩ রকেটের মাধ্যমে মার্টিন মুনস এক্সপ্লোরেশন (MMX) নামের এই অত্যাধুনিক মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাকসার তথ্য অনুযায়ী, উৎক্ষেপণের পর আনুমানিক এক বছর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মহাকাশযানটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে। এরপর ফোবোসকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন বছর ধরে প্রদক্ষিণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে এর পৃষ্ঠে অবতরণ করবে এবং অন্তত ১০ গ্রাম শিলা ও ধূলিকণা সংগ্রহ করবে।
অবতরণের পূর্বে উপযুক্ত ও নিরাপদ জায়গা শনাক্ত করতে মহাকাশযানে থাকা ‘আইডেফিক্স’ নামের একটি বিশেষ রোভার ফোবোসের উপরিভাগ পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে মঙ্গলের দ্বিতীয় উপগ্রহ ‘ডেইমোস’-কেও খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করবে এমএমএক্স। ফরাসি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী প্যাট্রিক মিশেল জানান, এই মিশনটি এমন সব মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা তুলে ধরবে, যার মাধ্যমে প্রাচীন সৌরজগতের বাইরের অংশ থেকে পানি, উদ্বায়ী গ্যাস ও জৈব যৌগ ভেতরের পাথুরে গ্রহগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ গঠনে কাজ করেছিল।
ফোবোসে অবতরণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং, কারণ উপগ্রহটির অভিকর্ষ বল বা গ্র্যাভিটি প্রায় নেই বললেই চলে। দুর্বল মহাকর্ষের কারণে অবতরণের সময় যানটিকে স্থির রাখা কঠিন। এছাড়া ২০২০ সালে গ্রহাণু থেকে নমুনা এনে জাপান ইতিহাস গড়লেও, এমএমএক্সের ক্ষেত্রে মঙ্গলের নিজস্ব শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টান কাটিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরতে প্রচুর জ্বালানি ও নিখুঁত গণনার প্রয়োজন।
বর্তমানে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের মধ্যে এক তীব্র বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতা চলছে। চীনের ‘তিয়ানওয়েন-৩’ ও মার্কিন নাসা-র নিজস্ব উদ্যোগের বিপরীতে জাপানের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, ফোবোসের বুকে মঙ্গলের নিজস্ব ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অমূল্য স্মারক সংরক্ষিত আছে। মঙ্গলের সঙ্গে কোনো প্রকাণ্ড মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে ফোবোসের সৃষ্টি হয়ে থাকলে, এর পৃষ্ঠে মঙ্গলের মাটির চেয়েও বৈচিত্র্যময় নমুনা পাওয়া যাবে, যা মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের ধারণাকে বদলে দিতে পারে।