
ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজনীতিতে এখন এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই কনট প্লেসসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাজপথ উত্তপ্ত করে রেখেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। তাদের সেই আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং রাজপথ থেকে তাদের হটাতে এবার মাঠের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে সম্পূর্ণ নতুন এক গোষ্ঠী, যার নাম রাখা হয়েছে ‘লাল হিট জনতা পার্টি’।
দিল্লির ঐতিহাসিক মালব্য স্মৃতি ভবনে নিজেদের প্রথম বড়সড় সদস্য সমাবেশের আয়োজন করে এই নতুন দলটি। সমাবেশ থেকে তারা সিজেপির রাজনৈতিক পথচলা, বিরোধী দল কংগ্রেস এবং রাজপথে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। লাল হিট জনতা পার্টির নেতাদের মূল অভিযোগ, এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও লাগাতার আন্দোলনের ফলে একদিকে যেমন দেশের বড় বড় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ও ভরসা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে রাজপথ অবরুদ্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে শত শত কোটি রুপির আর্থিক লোকসান।
সমাবেশে নতুন এই সংগঠনের প্রধান অয়ন ভাটনগর তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা খোলাসা করেন। তিনি জানান, খুব অল্প সময়ের নোটিশে তারা বিপুলসংখ্যক মানুষকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার যে সক্ষমতা রাখেন, সেটি দেখানোই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। আন্দোলনকারীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি দেশের স্বার্থে জনগণকে রাজপথে নামার উদাত্ত আহ্বান জানান, তবে কত কোটি মানুষ একসাথে সমবেত হতে পারেন সে ধারণা কি তাদের আছে?
পবিত্র উৎসব দশেরার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি মূলত অসুরের বিরুদ্ধে সুরের কিংবা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও সত্যের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক। তাই দেশবাসীকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সুরক্ষায় রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান তিনি। বক্তৃতা দেওয়ার সময় অয়ন ভাটনগর সিজেপির আন্দোলনকারীদের সরাসরি তেলাপোকা, পোকামাকড় এবং কীটপতঙ্গ সদৃশ প্রাণী বলে আখ্যা দেন।
রাজনীতির মাঠে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের সরকার পরিবর্তন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যেরও কড়া সমালোচনা করেন ভাটনগর। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে রাস্তাঘাট অচল করে সহিংস বিক্ষোভ দেখিয়ে কীভাবে একটা নির্বাচিত সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব? আজ যদি একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা করে, তবে কাল তারা দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েও রাস্তায় নেমে পড়বে। একটি দাবির পেছনে ৩০ বা ৫০ হাজার লোক জড়ো হলেই যে সরকারের কাছে তা মেনে নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, এমন কোনো যুক্তি বা নিয়ম নেই বলে তিনি জোর দাবি জানান।
নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে অয়ন ভাটনগর মনে করিয়ে দেন যে, ২০২৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ স্বচ্ছ একটি আইনি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যেখানে দেশের বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাকেও মূল বাছাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের আওয়াজ তোলার আগে আন্দোলনকারীদের উচিত ছিল আগের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক ইতিহাস ভালো করে জেনে নেওয়া।
লাল হিট জনতা পার্টির মূল উদ্দেশ্য যে ভারতে গণতন্ত্র রক্ষা করা, সে কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিযোগ করেন, সিজেপির এই নৈরাজ্যের মূল উদ্দেশ্যই হলো দিল্লি পুলিশ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরের ওপর জনগণের ভরসা পুরোপুরি নষ্ট করে দেওয়া। তাঁর দাবি, এই আন্দোলনের নেপথ্যে পেছন থেকে ইন্ধন জোগাচ্ছে কংগ্রেস ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মতো বিরোধী সংগঠনগুলো। এদের একমাত্র সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে হটিয়ে নিজেদের ক্ষমতার মসনদে বসানো।
বিক্ষোভকালে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের প্রতি আন্দোলনকারীদের আক্রমণাত্মক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় সমাবেশ থেকে। ভাটনগর বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিয়মিত সূর্য নমস্কার করেন এবং হয়তো অনেক কটু কথা বা মৌখিক অপমান নীরবে সহ্য করে নেন, তবে তার অর্থ এই নয় যে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সাধারণ মানুষও প্রতিদিন এই অপমান সহ্য করে যাবে। পুলিশের গায়ে হাত তোলা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে গালিগালাজ করা কখনোই বরদাশত করা হবে না জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এই শুভ দশেরার দিন থেকেই ককরোচ জনতা পার্টি নামক অশুভ শক্তির পতনের চূড়ান্ত ঘন্টা বেজে যাবে।
সমাবেশে উপস্থিত প্রখ্যাত কথক নৃত্যশিল্পী রিচা গুপ্তও দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ পুরো বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। অথচ দেশের বিশাল তরুণ সমাজ সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে কিছু চক্রান্তকারীর বিভ্রান্তিকর পথে পা বাড়াচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক পবন নামক এক বক্তা জনপ্রিয় কীটনাশক ব্র্যান্ড হিটের নাম টেনে নিয়ে হাস্যরসের ছলে বলেন, যেখানে যেখানে তেলাপোকার উৎপাত ছড়াবে, সেখানে সেটিকে নিধন করতে লাল হিট থাকবেই। ব্যবসায়ী মহলের মারাত্মক উদ্বেগের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, রাজপথে ককরোচ পার্টির এই অহেতুক বিশৃঙ্খলা ও ধর্মঘটের কারণে ইতিমধ্যেই খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩ হাজার কোটি রুপির বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। পরিস্থিতি যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ শিগগিরই ১০ হাজার কোটি রুপির কোটা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সবশেষে অয়ন ভাটনগর জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ এই জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ে কেবল দেশবাসীই নন, বরং কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দের থেকেও তারা অভূতপূর্ব সাড়া ও সমর্থন পাচ্ছেন। দেশের ঐতিহ্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে তিনি সবাইকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে এসে সরাসরি রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখার একাত্ম আহ্বান জানান।