
মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ঠিক ছয় দিন পর মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা জুহুতে বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের ওপর আকস্মিক গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই দুই চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক মিল। উভয় ক্ষেত্রেই বলিউড সুপারস্টার সালমান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্কের জেরে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম সরাসরি জড়িয়েছে এবং হামলার টার্গেট করা হয়েছে।
মুম্বাই পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই সশস্ত্র হামলায় টাইগার শ্রফ নিজে অক্ষত থাকলেও তাঁর গাড়িচালক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভয়েস রেকর্ডিং বা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। সেখানে অনিল পণ্ডিত পরিচয়ে এক ব্যক্তি স্পষ্ট হুমকি দিয়ে বলেন, ‘‘পুরো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে যারা আমাদের তোয়াক্কা না করে কাজ করবে কিংবা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবে, তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। এটি আমাদের পক্ষ থেকে প্রথম ও শেষ সতর্কবার্তা।’’ ওই অডিও ক্লিপে এই হামলার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে হারমান সান্ধু নামের এক সহযোগীর নামও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, অডিওতে উল্লেখিত অভিযুক্ত হারমান সান্ধু বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। একইভাবে, ২০২৪ সালে আলোচিত বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের পর দায় স্বীকারকারী শুভম লোনকারও মার্কিন মুলুকেই লুকিয়ে রয়েছে।
বলিউড ও রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন তারকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্কের জন্য পরিচিত ৬৬ বছর বয়সি প্রবীণ রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকী ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর রাতে বান্দ্রা (পূর্ব) এলাকায় তাঁর ছেলে জিসান সিদ্দিকীর দপ্তরের ঠিক বাইরে তিন দুর্বৃত্তের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন। দুর্গাপূজা ও দশেরা উৎসবের কারণে সেই সময় মুম্বাই পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা সত্ত্বেও এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিষ্ণোই গ্যাংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভম লোনকার পরিচয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে এর দায় স্বীকার করা হয়। সেখানে সালমান খানের সঙ্গে সিদ্দিকীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা এবং গ্যাংয়ের টার্গেটে থাকা অভিনেতার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত অনুজ থাপানের পুলিশ হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যুর বিষয়টি এই হত্যার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ওই পোস্টে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছিল, ‘‘যিনিই সালমান খানকে সাহায্য করবেন... আপনারা আপনাদের হিসাব মিলিয়ে রাখুন।’’ এছাড়া সালমানের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের যোগসূত্র রয়েছে বলেও সে সময় অসত্য দাবি করা হয়েছিল।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, বাবা সিদ্দিকীকে যারা হত্যা করেছিল, তারা তার বাসা ও কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে রিকি বা নজরদারি করে আসছিল। ঘটনাস্থল থেকেই স্থানীয় জনতা গুরমাইল সিংহ ও ধর্মরাজ কাশ্যপ নামের দুজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীতে মূল শুটার শিবকুমার গৌতমকে উত্তরপ্রদেশের বাহরাইচ থেকে নেপাল পালানোর সময় গ্রেপ্তার করা হয়। গৌতম পুলিশকে জানান, এই হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা ছিলেন আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছোট ভাই অনমল বিষ্ণোই। পরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ আদালত এই মামলায় অভিযুক্ত ২৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনমল বিষ্ণোইকে বিতাড়িত করার পর জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে তিনি একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি হিসেবে দিল্লির তিহাড় জেলে কঠোর নিরাপত্তায় বন্দি রয়েছেন।
বহু বছর আগের এক কালো হরিণ শিকারের মামলার সঙ্গে সালমান খানের কথিত সম্পৃক্ততা এবং বন্যপ্রাণী প্রেমের প্রতি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে গত কয়েক বছর ধরে বলিউড সুপারস্টার সালমান খান ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের একপ্রকার টার্গেট করে আসছে এই অপরাধচক্র।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় সালমান খানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে গুলি চালায় দুষ্কৃতকারীরা। পরে গুজরাট থেকে ভিকি গুপ্ত ও সাগর পাল নামের দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় অনমল বিষ্ণোই হামলার দায় স্বীকার করে একে একটি ‘ট্রেলার’ এবং ‘প্রথম ও শেষ সতর্কবার্তা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। রোববারের নতুন অডিও ক্লিপটিতেও অনিল পণ্ডিত প্রায় একই কায়দায় সেই ভাষার পুনরাবৃত্তি করেছেন।
মামলার চার্জশিটে দেওয়া নিজস্ব জবানবন্দিতে সালমান খান বলেছিলেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ‘‘আমার পরিবারের সদস্যরা যখন গভীর রাতে ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আমাকে ও আমার পরিবারকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।’’ এছাড়া তিনি ২০২২ সালে একটি হুমকি চিঠি, ২০২৩ সালের মার্চে ইমেইলের মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে পানভেলের খামারবাড়িতে অনুপ্রবেশ চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে নবি মুম্বাই পুলিশ সালমানের খামারবাড়ি ও তাঁর কর্মক্ষেত্র রেকি করার অভিযোগে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে।
শুধু সালমান নন, অভিনেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অনেক তারকা ও শিল্পপতিরাও বারবার এই গ্যাংয়ের হামলার শিকার হয়েছেন। কানাডার সারিতে জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা কপিল শর্মার ক্যাফেতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। নেটফ্লিক্সের একটি শোয়ে সালমান খানকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর অপরাধেই ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছিল বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যরা।
চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারি মাসে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির জুহুর বাসভবনেও গুলি চালানো হয়। সেই হামলার দায়ও শুভম লোনকারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেই স্বীকার করা হয়েছিল এবং রোববারের অডিওতে উল্লেখিত সেই হারমান সান্ধুর নামই সেখানেও জড়িত ছিল। এছাড়া নিহত বাবা সিদ্দিকীর ছেলে বিধায়ক জিসান সিদ্দিকীও নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আসছেন। একই কারণে প্রখ্যাত পাঞ্জাবি গায়ক এপি ঢিল্লো ও গুরু রানধাওয়াকেও তাদের নিশানায় রাখা হয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনায় পুরো বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।