
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আট মাস পর দেশের সার্বিক অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক পরিবেশ ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক মিশ্র বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সরকারের মেয়াদ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলা করে পথচলা শুরু করতে হয় নয়া প্রশাসনকে। বিগত সরকারের সময়কার বহু জটিল সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও, গত আট মাসে বিএনপির গৃহীত বেশ কিছু সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখন দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় যে বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী খুন, ডাকাতি কিংবা অপহরণের মতো গুরুতর মামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও চুরির ঘটনা তুলনামূলক বেড়েছে। একই সাথে অপরাধ দমনে পুলিশি তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও দেশে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতার মতো ঘটনা থামানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার সুরক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত না করতে পারা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালী মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে না পারাই সার্বিক নিরাপত্তার প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ার প্রধান কারণ।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি আসা এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়া নিশ্চিতভাবেই একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উচ্চ মূল্য বৃদ্ধি এবং মজুরি হারের সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর জীবনযাত্রার খরচের চাপ অব্যাহত রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস, চড়া সুদের ঋণ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ী মহল থেকে কিছুটা সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরকারের প্রশাসনিক পরিচালন খরচ কমালেও তা উৎপাদন ও পরিবহনে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা দেখা গেছে। ভারতের সাথে শেখ হাসিনার অবস্থানকেন্দ্রিক জটিলতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা থাকলেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরালো করার ওপর নজর দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। চীন থেকে মেগা প্রকল্পে সহায়তার আশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে এয়ারবাস ও বোয়িং ক্রয়ের মতো সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল সংগ্রহের জোরালো দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। গত গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং গতিশীলতার অভাব দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধানে স্বাধীন কমিশনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম আট মাসে পতনমুখী পরিস্থিতি ঠেকানোর কিছু প্রয়াস দেখা গেলেও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার আসল পরীক্ষা এখনো বহুলাংশে বাকি রয়ে গেছে।