যিনি সুর ও বাণীর সুষমায় গেয়ে গেছেন ‘সত্য বল সুপথে চল, ওরে আমার মন’, সেই কালজয়ী মানবতাবাদী সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ। জাত-ধর্মের সব সংকীর্ণ বিভেদ পেছনে ফেলে অসাম্প্রদায়িক মানববাদ ও আত্ম-অনুসন্ধানের বাণী প্রচার করে যাওয়া এই মরমী সাধককে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ও গবেষক। লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, সংগীতের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং বাংলার লোকঐতিহ্যের নানা দিক নিয়ে ঢাকা পোস্টের বিশেষ আয়োজনে নিজের অনুভূতি ও দীর্ঘ সাধনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন প্রখ্যাত লালনসংগীতশিল্পী শফি মণ্ডল।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নিজের সংগীতজীবন এবং লালনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যাত্রার স্মৃতিচারণ করে শফি মণ্ডল জানান যে, লালনকে তিনি সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি, তবে মূলত লালনের বাণীর প্রবল টানেই তাঁর বাউল গানের সাথে পরিচয় ঘটেছে। প্রায় চার থেকে পাঁচ দশক ধরে এই বাণীর পথ ধরেই তিনি চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর গুরু প্রয়াত সুলতান খতি সাহেবের সান্নিধ্যে আসার পর তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন। গুরুর নির্দেশেই জীবনের সকল জাগতিক কামনা-বাসনা ত্যাগ করে ফকিরি পথ ও সাদা পোশাক গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সেই নিয়মকানুন মেনে এই সাধনার পথে অবিচল রয়েছেন।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্বদরবারে লালনের দর্শনের প্রসার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শফি মণ্ডল জানান যে, নব্বইয়ের দশকে বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রবাসীদের কাছে গানের মর্মার্থ পৌঁছানো বেশ কঠিন ছিল। তবে বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে যেকোনো ভাষার মানুষ অনুবাদ ও ইন্টারনেটের সাহায্যে লালনের বাণী খুব সহজে অনুধাবন করতে পারছেন। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার গবেষক এবং দার্শনিকেরা লালনের সততা ও মানবকল্যাণমুখী দর্শনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে তা নিয়ে গবেষণা করছেন এবং নিয়মিত লেখালেখি করছেন, যা বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতা দিচ্ছে।
লালনের দর্শনের মূল সুর তুলে ধরে এই গুণী শিল্পী বলেন যে, লালন ফকির কখনোই কোনো ধর্মকে ছোট বা খাটো করেননি, বরং তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় চরম মানবসত্যের কথা প্রচার করেছেন। তিনি এমন এক সুন্দর মানুষ বা মনের মানুষের সন্ধানের কথা বলেছেন, যার কাছে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করা যায়, কারণ এই মহাবিশ্বে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতির কথা স্বীকার করলেও শফি মণ্ডল বর্তমান তরুণ প্রজন্মের লালনচর্চা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বা উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম থেকে ফেরা তরুণেরা এখন আরও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক ও উচ্চমার্গে লালনকে অনুধাবন করছে এবং তারাই বিশ্বদরবারে সাঁইজির বাণী সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তিরোধান দিবস পালনের বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকার কথা জানিয়ে শফি মণ্ডল বলেন যে, তাঁর পুরো জীবনটাই তো লালনকে ঘিরে আবর্তিত হয়। গত বছর লালন স্মরণোৎসাবের সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও এবার কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া ধামে সরাসরি উপস্থিত থেকে সাঁইজির প্রতি ভক্তি নিবেদন করবেন। সেখান থেকে ফিরে এসে গণমাধ্যমের সাথে লালনের গান ও অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের প্রচার ও প্রসার নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।