
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পর বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে উত্তরা এলাকা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিজস্ব তালিকা অনুযায়ী কেবল উত্তরার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় রয়েছে ত্রিশটিরও বেশি কিশোর গ্যাং। স্থানীয় রাজনৈতিক বড়ভাইদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই অপরাধ চক্রগুলো কোনো ধরনের বাধাবিহীনভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের চরম উৎকণ্ঠার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে ‘দে লাড়া’ গ্রুপ, যার নেতৃত্বে রয়েছে পিচ্চি সানিখ্যাত সাকিবুল হাসান সানি। উত্তরা থেকে শুরু করে উত্তরখান, দক্ষিণখান এবং টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে এই গ্রুপের বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্ক।
সম্প্রতি যুগান্তর টিমের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই গ্যাংয়ের ভেতরের একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন খোদ গ্রুপের কিছু সদস্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরখান ৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন রেলপথের দুইপাশজুড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল মাদকের হাট। গাঁজা, ইয়াবা, আইস এবং ফেনসিডিলের মতো নিষিদ্ধ মাদকের কোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য প্রকাশ্যে নিয়ন্ত্রিত হয় এই দে লাড়া গ্রুপের মাধ্যমেই। গত ৩১ আগস্ট পুলিশ পিচ্চি সানিকে গ্রেফতার করলেও রহস্যজনকভাবে মাত্র একদিনের মধ্যেই ৩০ লাখ টাকার মোটা অংকের বিনিময়ে সে জামিনে মুক্ত হয়ে যায় এবং এলাকায় বিশাল শোডাউন দিয়ে পুনরায় আধিপত্য বিস্তার করে। গ্যাংয়ের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে রায়হান ছাড়াও পলাশ, রনি শিকদার, মশিউর ও ফাহিমের মতো অপরাধীরা এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে।
কিশোর গ্যাংয়ের এই রমরমা প্রসারের পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলোও অত্যন্ত প্রকট। স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পেশিশক্তি প্রদর্শন তরুণ প্রজন্মকে অপরাধের দিকে আকৃষ্ট করছে। গ্যাংয়ের সদস্যরা টাকার লোভ ও ক্ষমতার মোহে খুব সহজেই মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন একমাত্র খেলার মাঠটি বেদখল হয়ে মার্কেট নির্মিত হওয়ায় তরুণদের সুস্থ বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। ফলে বখাটেদের অবাধ বিচরণের কারণে সাধারণ পরিবারগুলো তাদের ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
উত্তরা এলাকায় দে লাড়া গ্রুপ ছাড়াও আরও বেশ কিছু শক্তিশালী কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বিগ বস গ্রুপ (ছোটন খান), সুমন ওরফে শাহিদ গ্রুপ, দেওয়ান গ্রুপ, সেক্টর ইলেভেন গ্রুপ (সিনহা রহমান), নূর খান গ্রুপ এবং হৃদয় গাজী গ্রুপ অন্যতম। উত্তরা পূর্ব ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে এই গ্যাংগুলোর দাপটে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন অভিযান চালানো হলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং অর্থের জোরে এই কিশোর গ্যাং কালচার পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হচ্ছে না, যা রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলার জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।