
মিয়ানমারের সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির নিষ্ঠুর বাস্তবতা মাথায় নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের শৈশব কাটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। হাজারও অভাব-অনটন ও সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে বন্দি থেকেও তারা কেবল অন্যের ত্রাণের আশায় হাত গুটিয়ে বসে নেই; বরং নিজেরাই বুক চিতিয়ে এগিয়ে এসে একে অপরের পরম আস্থার প্রতীক ও সুরক্ষার প্রথম দেয়াল হয়ে উঠেছে। চাইল্ড ক্লাব ও কিশোরী দলের মাধ্যমে ক্যাম্পের শিশুরা এখন বাল্যবিয়ে প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
জাতিসংঘের শিশুসুরক্ষা সাব-সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শনাক্ত হওয়া শিশুসুরক্ষা ঝুঁকির প্রায় ৮ শতাংশই সরাসরি বাল্যবিয়ে বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে ৯৯ শতাংশ ভুক্তভোগীই কিশোরী বা মেয়েশিশু। মূলত পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সব বাধা পেরিয়ে বড় আশার আলো দেখাচ্ছে শিশুরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, শিশুদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ঘটনার প্রায় ২০ শতাংশই প্রথম শনাক্ত করে স্থানীয় প্রটেকশন কমিটিগুলো এবং অন্তত ২ শতাংশ ঘটনা শিশু ও কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা সরাসরি প্রতিরোধ বা রিপোর্ট করছে।
কক্সবাজারের জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২ বছরের এক কিশোরীর সাহসিকতার গল্প এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা। পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলেও সে সহপাঠী ও সুরক্ষাকর্মীদের সহায়তায় নিজের বাল্যবিয়ে চিরতরে বন্ধ করে। নিজের বিয়ে থামিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সে, বরং ক্যাম্পের অন্য কিশোরীদের মাঝেও বাল্যবিয়ে এড়ানোর উপায় ও নিরাপদ থাকার জীবনপাঠ পৌঁছে দিচ্ছে। তার মতো ১৫ বছরের রহিমুল্লাহ কিংবা ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা নুসাবার মতো বহু শিশুই এখন ক্যাম্পের চেনা ও পুরোনো দৃশ্যপট পাল্টে দিচ্ছে।
শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের শেখার বিষয় কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, শরীরের ব্যক্তিগত সীমারেখা, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শনাক্ত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনমুখী শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে। ইউনিসেফ ও অংশীদার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩২০টির বেশি ‘শিশু নেতৃত্ব দল’ গঠন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ শিশু-কিশোর, যারা খেলাধুলা ও নানা সৃজনশীল উপায়ে ছোটদের পরিচ্ছন্নতা শেখানোসহ ঝরে পড়া সহপাঠীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনছে।
শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেখে ক্যাম্পের অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ ও ‘ব্র্যাক’-এর মতো সংস্থার উঠান বৈঠক ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ব সেশনের মাধ্যমে পরিবার ও কমিউনিটির সহযোগিতায় বাল্যবিয়ে প্রবণতা হ্রাসের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সৃজনশীল ও ইতিবাচক কাজে যুক্ত রাখার এই সুযোগ ধরে রাখতে পরিবার, কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি, যাতে এই খুদে পরিবর্তনের কারিগররা তাদের এই মহৎ যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।