
বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র ০.০৫ শতাংশ হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটিকে বছরের পর বছর ধরে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। হিমালয়ের বরফ গলা, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ভূমিধস এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশটির স্বাভাবিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। একইভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রেখেও কেন একটি দেশকে এমন চড়া মূল্য দিতে হবে, সেই প্রশ্নটি আজ কেবল নেপালের নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক বিশ্লেষণে নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, বারবার নেমে আসা দুর্যোগ দেশটির স্বাভাবিক অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে থমকে দিচ্ছে। একটি দুর্যোগের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন দুর্যোগ হানা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনর্বাসনে সরকারকে বিপুল বরাদ্দ দিতে হচ্ছে, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের বাস্তব চিত্রও হুবহু এক। খুলনাসহ সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকায় প্রতিনিয়ত লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে কৃষি এবং সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে। অপরদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা কিংবা সুনামগঞ্জের মতো অঞ্চলগুলোতে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে হাজার হাজার পরিবার সর্বস্ব হারাচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেবল ঘরবাড়ি বা ফসল ধ্বংস করছে না, বরং স্থানীয় কর্মসংস্থান ধ্বংসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের শিক্ষাজীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থা ও তার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক দরবারে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে মিলছে সামান্যই, যা আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঋণনির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে দেশগুলোর দায় নগণ্য, দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে তাদের ঘাড়েই আবার ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই অসংগত ও অন্যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার, উপকূলীয় বাঁধার অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং জলবায়ুসহনশীল কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। নেপালের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, দুর্যোগের পর কেবল ত্রাণ দেওয়া নয়, বরং দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই আগাম বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা গড়ে তোলাই হলো একমাত্র টেকসই সমাধান।