
মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা একমাত্র স্থান হিসেবে এখন পর্যন্ত কেবল পৃথিবীর নামই আমাদের জানা। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে যেগুলো প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের জন্য পৃথিবীর চেয়েও বহু গুণে বেশি উপযোগী। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের সম্ভাব্য জগৎগুলোকে বলা হচ্ছে ‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস’ বা অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ।
গবেষকদের মতে, এসব গ্রহে উষ্ণ জলবায়ু, প্রচুর পরিমাণে পানি এবং এমন এক স্থিতিশীল প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকতে পারে, যা পৃথিবীর তুলনায় বহু কোটি বছর বেশি সময় ধরে প্রাণের বিবর্তন ও টিকে থাকাকে সহায়তা করবে। পৃথিবীর চেয়ে আয়তনে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বড় এবং দ্বিগুণ ভরের গ্রহগুলোতে শক্তিশালী অভিকর্ষ বলের কারণে ঘন বায়ুমণ্ডল ও বড় লৌহকেন্দ্রের শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হওয়া সম্ভব, যা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে প্রাণকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়াও এসব গ্রহে অগভীর সমুদ্র, প্রচুর হ্রদ ও দ্বীপ থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করার জন্য অত্যন্ত আদর্শ।
এই গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামের এক প্রকার কমলা রঙের বামন নক্ষত্রের কথা। সূর্য অপেক্ষা আকারে ছোট ও শীতল এই নক্ষত্রগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে জ্বালানি পোড়ায়, যার ফলে এগুলো কয়েক হাজার কোটি বছর পর্যন্ত আলো ছড়াতে সক্ষম। জার্মানির বার্লিনের জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রের কৃত্রিম কমলা আলোয় তৈরি উদ্ভিদের বৃদ্ধি সাধারণ সূর্যালোকের চেয়েও দ্রুত হয়েছে। এর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরা গ্রহগুলোতে সালোকসংশ্লেষণ আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং ২০১৪ সালে এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন যে, প্রাণের উপযুক্ত পরিবেশের জন্য শুধু পৃথিবীর মডেলকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরা ঠিক নয়। কারণ বর্তমানে সূর্যের ক্রমবর্দ্ধমান উত্তাপের ফলে আগামী ৫০ কোটি বছর পর পৃথিবীতে জটিল জীবনের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর বিপরীতে কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত গ্রহগুলো বহু দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল থাকে, যা সেখানে অতি বৈচিত্র্যময় প্রাণের বিকাশে বাড়তি সময় দেয়।
তবে এই সবকিছুই এখনো তাত্ত্বিক গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের সন্ধান মেলেনি। তবে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ২০২৭ সালের ‘প্ল্যাটো’ মিশন, চিলির এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ এবং ২০৪০-এর দশকে নাসার উৎক্ষেপণযোগ্য ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এমন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রাণসংক্রান্ত কোনো গ্যাসের সংকেত রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।