
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ভয়াবহ নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং ভাসানচরের ঘিঞ্জি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার অর্ধেকেরও বেশি আজ শিশু। খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল আর বাঁশের বেড়ার তৈরি এই অস্থায়ী বসতি কেবল তাদের স্বাভাবিক শৈশবই কেড়ে নেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক সহায়তার তীব্র ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদী অপুষ্টি ও নানা সংক্রামক রোগের মাঝখানে তাদের জীবনকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। খাদ্য ও চিকিৎসার পাশাপাশি এসব শিশুর জীবনে দ্বিতীয় প্রধান সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে শিক্ষা ও সুরক্ষা, যা তাদের ভবিষ্যৎকে এক বিরাট ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পের ১০ লাখের বেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত চার লাখ শিশু স্কুলগামী হলেও তহবিলের মারাত্মক সংকটের কারণে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ শিশু এখনও শিক্ষার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। ইউনিসেফ এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার নিরলস প্রচেষ্টায় কিছু লার্নিং সেন্টার বা শিক্ষাকেন্দ্র চালু থাকলেও বাজেট স্বল্পতার কারণে পুরোনো বই, সংকুচিত পাঠ্যসূচি এবং জরাজীর্ণ ভবনেই কোনোমতে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, রক্ষণশীলতা এবং বাল্যবিয়ে বা শিশুশ্রমের নির্মম শিকার হয়ে বড় একটি অংশের ঝরে পড়ার হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শিক্ষা ও শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বর্তমানে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যাম্পের বিপুলসংখ্যক মানুষ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন, যার প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছে এই ট্রমাগ্রস্ত শিশুরা। তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাচ্ছে সচেতন মহল। ইউনিসেফ ও স্থানীয় সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে প্রবর্তিত 'পজিটিভ প্যারেন্টিং' বা ইতিবাচক অভিভাবকত্ব চর্চা ক্যাম্পের সনাতন লালন-পালন ধারা বদলাতে শুরু করেছে। বাবা-মা ও ধর্মীয় নেতারা এখন সন্তানদের মারধর না করে বন্ধুর মতো আচরণ করা, বাল্যবিয়ে রোধ এবং কন্যাসন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পক্ষে জনসচেতনতা তৈরি করছেন। অদম্য ইচ্ছা শক্তিকে পুঁজি করে সামুদা কিংবা আজিফাদের মতো অনেক রোহিঙ্গা কিশোরী পিতৃতন্ত্রের দেয়াল ভেঙে আজ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সমগ্র শিবিরের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।