
আন্তর্জাতিক মানবতা, ন্যায়বিচার এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র দক্ষিণ আফ্রিকার ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ বিচারক নাভানেথেম "নাভি" পিল্লাই ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা, গণহত্যা রোধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অনন্য সাহসিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করে। পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করে পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের এক তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণকারী নাভি পিল্লাই বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। নিজের যোগ্যতাবলে তিনি নাতাল প্রদেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক নির্বাচিত হন। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অনেক রাজবন্দীর আইনি সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে এবং ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন তিনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলায় অন্যতম বিচারক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে যে আন্তর্জাতিক আইন যখন নানামুখী রাজনৈতিক চাপ ও আক্রমণের মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই নাভি পিল্লাইকে এই সম্মাননা প্রদান করা বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে। বিশেষ করে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' এবং আন্তর্জাতিক আইনি ইতিহাসে প্রথমবার রেডিও প্রচারণার মাধ্যমে উসকানি দেওয়াকে 'গণহত্যার অংশ' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে তাঁর ভূমিকাকে স্মরণ করে নোবেল কমিটি। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক তাঁর এই অর্জনকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও বিশ্বশান্তির জন্য এক ঐতিহাসিক জয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নোবেল পাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নাভি পিল্লাই এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সহিংসতার শিকার সমস্ত সারভাইভার বা বেঁচে যাওয়া মানুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার কথা জানান।