
আজ থেকে ৬৯ বছর আগে, ১৯৫৭ সালের এই দিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে। এটিই ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে কার্যত সূচনা হয় মহাকাশ যুগের। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এর এক দশক পর, ১৯৬৭ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হয় ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তি। মহাকাশ অনুসন্ধান ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করে।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ ৪ থেকে ১০ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। মানবকল্যাণে মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান তুলে ধরাই এর মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুল, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, জাদুঘর ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্লাব নানা আয়োজন করে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞান ক্লাস, প্রদর্শনী এবং নভোচারী ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা।
বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি ৫০টিরও বেশি দেশের মানুষ মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আরেকটি বড় মাইলফলক আসে ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। ওই দিন সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে যাওয়া প্রথম মানুষ হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন।
‘ভস্তক-১’ মহাকাশযানে করে তিনি ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করেন। পুরো অভিযানে সময় লাগে মাত্র ১০৮ মিনিট। পরে মহাকাশযান থেকে বের হয়ে প্যারাসুটের মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতরণ করেন তিনি।
গ্যাগারিনের এই অভিযান প্রমাণ করে, মানুষ রকেট উৎক্ষেপণের প্রচণ্ড চাপ, মহাশূন্যের ওজনহীন পরিবেশ এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের ধাক্কা সহ্য করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে শীতল যুদ্ধের মহাকাশ প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বড় ধরনের প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করে।
১৯৬৭ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া আউটার স্পেস ট্রিটি মহাকাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতিমালা নির্ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এই চুক্তির প্রধান স্বাক্ষরকারী ছিল।
চুক্তিতে বলা হয়, মহাকাশ শান্তিপূর্ণভাবে অনুসন্ধান ও ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কোনো দেশ মহাকাশের কোনো অংশকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারবে না।
এর দুই বছরেরও কম সময় পর মানুষের মহাকাশ অভিযানে আসে আরও বড় সাফল্য। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নাসার অ্যাপোলো-১১ অভিযানে প্রথমবার মানুষ চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে। নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন।
মহাকাশ ঠিক কোন উচ্চতা থেকে শুরু হয়, এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে এককভাবে স্বীকৃত কোনো সীমারেখা নেই। তবে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থা **১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত ‘কারমান লাইন’**কে মহাকাশের প্রচলিত সীমা হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, নাসা এবং ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ৮০ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতায় উড্ডয়নকেও মহাকাশে প্রবেশ হিসেবে বিবেচনা করে।
শুনতে দূরের মনে হলেও মহাকাশের এই সীমা পৃথিবীর তুলনায় খুব বেশি দূরে নয়। পৃথিবীকে যদি একটি আপেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এর পৃষ্ঠ থেকে আপেলের খোসার পুরুত্বের কাছাকাছি দূরত্বেই মহাকাশের প্রচলিত সীমা ধরা যায়।
কারমান লাইনকে মাপকাঠি হিসেবে ধরলে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫২টি দেশের ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন। এই তালিকায় পেশাদার নভোচারীদের পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে মহাকাশে যাওয়া পর্যটকরাও রয়েছেন।
মহাকাশ ভ্রমণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী। আবার কয়েকজন এমন দেশের হয়ে মহাকাশে গেছেন, যেসব দেশ বর্তমানে আর অস্তিত্বশীল নয়। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন।
মহাকাশ ভ্রমণকারীর সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৬৯ জন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়া মিলিয়ে ১৩৮ জন মহাকাশে গেছেন।
নিজস্ব রকেটের মাধ্যমে মানুষকে মহাকাশে পাঠানো তৃতীয় দেশ হলো চীন। দেশটি এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে মহাকাশে পাঠিয়েছে।
মহাকাশ গবেষণা ও ভ্রমণ এখনো মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র। মোট ৭৪৬ জন মহাকাশ ভ্রমণকারীর মধ্যে নারী মাত্র ১১২ জন। অর্থাৎ মহাকাশ ভ্রমণকারীদের প্রায় ১৫ শতাংশ নারী।
১৯৬৩ সালের জুনে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী নভোচারী স্যালি রাইড মহাকাশে যান এর প্রায় ২০ বছর পর, ১৯৮৩ সালের জুনে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশ ভ্রমণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার প্রসার। ২০২০ সালের পর মহাকাশে যাওয়া নারীদের অর্ধেকের বেশি ব্লু অরিজিনের সাবঅরবিটাল রকেটের অর্থপ্রদানকারী যাত্রী বা অতিথি হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন।
মহাকাশে যাওয়া অধিকাংশ মানুষের প্রথম মহাকাশযাত্রার সময় বয়স ছিল ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই দুই বয়সসীমার মানুষই মোট মহাকাশ ভ্রমণকারীর প্রায় ৮৫ শতাংশ। মহাকাশ ভ্রমণকারীদের মধ্যম বয়স প্রায় ৪০ বছর।
তবে বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার বিস্তারের কারণে মহাকাশ ভ্রমণকারীদের বয়সের পরিসরও বাড়ছে।
২০২১ সালে মহাকাশে যাওয়া অলিভার ডেমেন ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী মহাকাশ ভ্রমণকারীদের একজন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বয়সে মহাকাশ ভ্রমণ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এড ডোয়াইট। ২০২৪ সালে মহাকাশ ভ্রমণের সময় তার বয়স ছিল ৯০ বছর ৮ মাস। এর আগে ২০২১ সালে মহাকাশে যাওয়া অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনারের চেয়েও ডোয়াইট প্রায় দুই মাস বেশি বয়সী ছিলেন।
স্পুটনিক-১-এর মাধ্যমে যে মহাকাশ যুগের সূচনা হয়েছিল, সাত দশকের কাছাকাছি সময়ে তা এখন পেশাদার নভোচারীদের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক মহাকাশ ভ্রমণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে চাঁদ, মঙ্গল ও আরও দূরের মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা সেই যাত্রাকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।