
প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এবং অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধ ছাড়াও মাদক, হত্যা ও চুরির মতো প্রায় সব ধরনের ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল ফরেনসিকের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই তুলনায় পুলিশের ডিজিটাল ফরেনসিকের সক্ষমতা বাড়েনি। এর ফলে সিআইডির ল্যাবগুলোতে ক্রমাগত আলামতের জট দীর্ঘ হচ্ছে এবং সময়মতো প্রতিবেদন না পাওয়ায় হাজার হাজার মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের মামলার তদন্তে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মূল দায়িত্ব পালন করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি। সংস্থাটির সদর দপ্তর এবং খুলনা বিভাগীয় ল্যাবের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঢাকা ও খুলনা ল্যাবে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত। অর্থাৎ বর্তমানে দুই ল্যাবে প্রায় ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে।
তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে ডিভাইস বিশ্লেষণের চাহিদা প্রায় ৩৭২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২ সালে যেখানে মাত্র ৭টি মামলার ১৮টি আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে হাজার হাজার মামলার আলামত জমা পড়েছে। ২০১৭ সালে মামলার নিষ্পত্তির হার ৯০ শতাংশ থাকলেও তা ক্রমান্বয়ে কমে বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ল্যাব সংশ্লিষ্টদের মতে, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বর্তমানে গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপ ও আধুনিক এআই প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে পুরোনো ডিভাইস ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের তথ্য বিশ্লেষণ করাও অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
ফরেনসিক রিপোর্ট সময়মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রাসঙ্গিক অনেক প্রমাণ লোপাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা সঠিক সময়ে ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি ভুয়া পরীক্ষার্থী আটকের মামলায় অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ থাকার পরও শুধু সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দীর্ঘ ৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।
ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা এই স্থবিরতার পেছনে প্রধানত ৪টি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নিত্যনতুন সাইবার অপরাধের উত্থান, এনক্রিপ্টেড ডিভাইস ও আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ্লিকেশনের ডেটা উদ্ধারে জটিলতা, ল্যাবের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত আলামতের চাপ এবং আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।
তবে এই সংকট নিরসনে সিআইডির পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় ইতিমধ্যে চট্টগ্রামে একটি নতুন বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি বিভাগে এই আধুনিক ল্যাব চালু করা গেলে ঝুলন্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।