
গাইবান্ধাজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুর ও শিয়ালের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরে জেলার বিভিন্ন স্থানে কুকুরের ধারাবাহিক তাণ্ডব এবং শিয়ালের আক্রমণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ছয় মাসে কুকুর ও শিয়ালের কামড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৪৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং এর মধ্যে এক শিশুসহ মোট ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাইবান্ধায় একের পর এক এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিংবা দায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পরই কেবল সাময়িক তৎপরতা দেখা যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের ভ্যাকসিন কেন্দ্রেই গত ছয় মাসে কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে প্রায় ৬ হাজার ৯৮০ জন মানুষ চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ২৫৬ জন। এছাড়া জেলার অন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারিভাবেও বহু মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
চলতি বছর বিভিন্ন সময়ে ঘটা মর্মান্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেশ উদ্বেগজনক। গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নে একটি পাগলা কুকুরের কামড়ে ২৬ জন আহত হন এবং পরবর্তীতে সঠিক চিকিৎসা সত্ত্বেও মে মাসে বিভিন্ন সময়ে পাঁচজন মারা যান। এরপর গত ২০ সেপ্টেম্বর একই উপজেলায় শিয়ালের কামড়ে নারী-শিশুসহ ৯ জন আহত হন। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামে একটি কুকুরের ধাওয়ায় গলায় কামড় খেয়ে সিনথিয়া (১২) নামের এক স্কুলছাত্রী প্রাণ হারায়।
এসব ঘটনার পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরির (সিডিআইএল) নমুনায় আক্রান্ত কুকুর ও শিয়ালের শরীরে প্রাণঘাতী র্যাবিস ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইইডিসিআর ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, র্যাবিস বা জলাতঙ্ক অত্যন্ত মারাত্মক একটি ভাইরাস, যা একবার স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে গেলে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে সময়মতো সচেতনতা, ক্ষতস্থান পরিষ্কার এবং দ্রুত ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে এই প্রাণঘাতী রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ সম্ভব। হাইকোর্টের আদেশে কুকুর নিধন বন্ধ থাকায় এবং কার্যকর বন্ধ্যাকরণ বা গণটিকা বা ম্যাস ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি নিয়মিত না থাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে দ্রুত এলাকায় এলাকায় কুকুর ও বিড়ালের গণটিকাদান কর্মসূচি চালুর জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।