
রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসারকে সাধারণ মানুষ কেবল দুটি সংখ্যার হিসাব হিসেবে ধরে নিলেও আমাদের হৃৎপিণ্ড বা হার্ট কিন্তু তা দেখে না। রক্তচাপ যখন দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মাত্রায় উচ্চ থাকে, তখন শরীরের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে হার্টকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়তি চাপ রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যখন একজন রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পরও রক্তচাপ কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ‘রেসিস্ট্যান্ট হাইপারটেনশন’ বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে (অর্থাৎ কমপক্ষে তিনটি ভিন্ন ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি থাকে), তাদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ২ থেকে ৬ গুণ বেশি। উপমহাদেশীয় অঞ্চলে এই সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে পরিচালিত বড় পরিসরের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের মাত্র ৮.৫ শতাংশের প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা পরিস্থিতি কতটা জটিল তা স্পষ্ট করে।
নিয়মিত ওষুধ ও কড়াকড়ি খাদ্যাভ্যাস সত্ত্বেও রক্তচাপ না কমার পেছনে বেশ কিছু শারীরিক ও জৈবিক কারণ কাজ করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো দায়ী থাকতে পারে:
ওষুধগুলো সঠিকভাবে এবং সঠিক মাত্রায় সেবন করা হচ্ছে কি না। রক্তচাপ মাপার পদ্ধতি সঠিক আছে কি না। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, স্থূলতা, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কিংবা কিডনির কোনো জটিলতা রয়েছে কি না। অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না। শরীরের হরমোনের কোনো অস্বাভাবিক প্রভাব রয়েছে কি না।
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম একটি প্রধান জৈবিক কারণ হতে পারে ‘অ্যালডোস্টেরন’ নামক হরমোন। এই হরমোনটি শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে কাজ করে। যখন শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় অ্যালডোস্টেরন তৈরি হয়, তখন শরীর অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি ধরে রাখে, যা রক্তচাপকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন শুধু সংখ্যা কমানোর জন্য নতুন ট্যাবলেট দেওয়ার পরিবর্তে এই ধরনের জৈবিক কারণ ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দূর করার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
অনেকেই মনে করেন শারীরিকভাবে সুস্থ বোধ করলেই হার্ট ভালো আছে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। উচ্চ রক্তচাপ হলো এমন এক নীরব ঘাতক, যার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও এটি নীরবে শরীরের ভেতরে বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করতে থাকে। তাই ওষুধ খাওয়ার পরও যদি রক্তচাপ টানা বেশি থাকে, তবে তা কোনোভাবেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার কৌশল পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।