
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের ঝুঁকিকে অমূলক মনে করা হলেও, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথা জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর বারবার ইচ্ছা প্রকাশ এবং বৈশ্বিক শুল্ক নীতির কারণে দুই দেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তাকে নিছক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখছে অটোয়া।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত ঘটার আশঙ্কা অত্যন্ত ক্ষীণ, তবুও কানাডীয় নাগরিকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনার পর পরিচালিত এক জনমত জরিপে ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় মার্কিন আগ্রাসনের কিছুটা হলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস জানান, দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি, ন্যাটো জোটের যৌথ নিরাপত্তা বিধান এবং নরডিক বা আর্কটিক অঞ্চলে ‘নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের’ অধীনে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের কারণে সরাসরি সশস্ত্র হামলা আকস্মিকভাবে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে সাইবার যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংঘাতের পথ বেছে নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় বর্তমানের মতো এতটা সুমধুর ছিল না। কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষকদের মতে, কানাডার নিজস্ব জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তিই গড়ে উঠেছে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। ১৭৭৫ সালের আগ্রাসন কিংবা ১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনীর আক্রমণ এবং এর জবাবে ব্রিটিশ ও কানাডীয় যৌথ বাহিনীর পাল্টা প্রতিশোধের ইতিহাস দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। এমনকি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও কানাডার সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় গোপন কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করেছিল।
বর্তমানে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বহুগুণে এগিয়ে থাকলেও কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান ইতোমধ্যে দেশের সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন, যার মধ্যে তিন লাখ পর্যন্ত নাগরিক-সৈনিক অন্তর্ভুক্তকরণের প্রস্তাব রয়েছে। বিশ্লেষক ম্যাথিউ শ্মিডট মনে করেন, মার্কিন বাহিনীর পক্ষেও কানাডার মতো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি আগ্রাসন চালানো সহজ হবে না, কারণ এ ধরনের আদেশের ক্ষেত্রে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেই নৈতিক কারণে বড় ধরনের পদত্যাগের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ভূ-রাজনৈতিক এই অনিশ্চয়তার যুগে কানাডা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন করে ঝালিয়ে নিচ্ছে।