
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় সব ধরনের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। যদিও এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন, তবুও এই ধরনের প্রস্তুতি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় ও আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট ইউনিভার্সিটির জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিডটসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে, কানাডার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সামনে এখন বেশ কিছু কঠিন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দেশটির বর্তমান অংশীদারত্ব এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি ভবিষ্যতে কানাডার নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে অটোয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মতো বিষয়গুলো সাধারণ মার্কিনদের কাছে কথার কথা মনে হলেও কানাডিয়ানরা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছেন এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন।
যদি তাত্ত্বিকভাবে কখনো এমন সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরিই হয়, তবে যুদ্ধের প্রথম ধাপটি বেশ সংক্ষিপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকায় প্রকাশিত সামরিক বাহিনীর একটি মডেল অনুযায়ী, মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আক্রমণের মুখে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার মূল কৌশলগত অবস্থানগুলো চরম চাপের মুখে পড়তে পারে। সংখ্যায় ও প্রযুক্তিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী বহু গুণে এগিয়ে থাকায় কানাডীয় বাহিনীকে তখন বাধ্য হয়ে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল বেছে নিতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদের সুরক্ষায় ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চাইতে হতে পারে। বিগত এক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম কানাডা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণের বিপরীতে কোনো সামরিক প্রতিরক্ষার ছক কষছে।
ইতিমধ্যে কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান সামরিক বাহিনীর আকার নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ স্বল্প-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিক-সৈনিককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকেও কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো সহজ হবে না। শ্মিডটের মতে, কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এবং সামরিক বাহিনীতে বড় ধরনের নৈতিক সংকট তৈরি হবে এবং বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা একে একটি অনৈতিক আদেশ হিসেবে গণ্য করে পদত্যাগ করতে পারেন। দুই দেশের সেনাসদস্যরা নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ নেওয়ায় একে অপরের প্রতি একধরনের পেশাদার শ্রদ্ধাবোধও কাজ করে।
তা সত্ত্বেও সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যদি সরাসরি সংঘাত বাঁধেই, তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার অমূল্য খনিজ সম্পদ ও তেল ক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিষ্ক্রিয় করার সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এগোবে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলার মতো সংকটের আদলে এই অভিযান পরিচালিত হতে পারে। শক্তির বিচারে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা আকাশচুম্বী হলেও, কানাডার মতো বিশাল ভূখণ্ডে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালানো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া সামলানো ওয়াশিংটনের জন্যও অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ হবে।