
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা বাংলামোটরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় এক ব্যবসায়ীকে রক্তাক্ত করা, প্রকাশ্যে ফাঁকা গুলি ছোঁড়া এবং নিজস্ব গোপন ‘টর্চার সেল’ বা নির্যাতন কক্ষ তৈরি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার মূলহোতা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমন ও তার সহযোগীদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালত প্রধান আসামি সাইমনকে চার দিন এবং তার অপর তিন সহযোগীকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এই ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চেপে রাখা আতঙ্ক এবং সাইমনের গড়ে তোলা অপরাধ সাম্রাজ্যের ভয়ংকর সব তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, যখন বাংলামোটর পেট্রোল পাম্পের গলিতে মো. সোহান নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর পথরোধ করে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন সাইমন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সাইমন চরম ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর চড়াও হন এবং পিস্তলের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে রক্তাক্ত জখম করেন। পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর করতে তিনি পরপর বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোঁড়েন। এ সময় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে এলে সাইমন ও তার সহযোগীরা একটি ভবনে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ, ডিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং স্থানীয়দের চরম ক্ষোভ ও অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্য থেকেই সাইমনসহ চারজনকে আটক করে হাতিরঝিল থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় রাতেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সোহান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে সাইমন ছাড়াও ওমর, মোর্শেদ ও শাওনের নাম উল্লেখ করা হয়। শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুনানি শেষে আসামিদের এই রিমান্ডের আদেশ দেন।
পুলিশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলামোটর এলাকার ফুটপাত, ভাসমান দোকান, রেস্তোরাঁ, বাসা-বাড়ি ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করতেন সাইমন। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তিনি এলাকার বিভিন্ন দোকানপাট ও সেলুন জোরপূর্বক নিজের দখলে নেন। নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে তিনি বাংলামোটর পেট্রোল পাম্পের গলির ৮০ নম্বর বাসার নিচতলার একটি কক্ষকে বানিয়েছিলেন নিজস্ব ‘টর্চার সেল’, যাকে স্থানীয়রা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিগত ছয় মাসে এই গোপন প্রকোষ্ঠে আটকে রেখে বিকাশ ব্যবসায়ী আব্দুর রউফ, ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী রিজওয়ান ও ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী রাজুসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন সাধারণ মানুষকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাইমনের চরম হুমকির কারণে সে সময় কেউ ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পেত না। উল্লেখ্য, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই তাকে যুবদল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও দলীয় পদ-পদবির নাম ভাঙিয়ে তিনি এই অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বর্তমানে রিমান্ডে থাকা আসামিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বাকি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।