
শৈশবের বিনোদনের জগতে কিছু চরিত্র সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায় না। প্রজন্ম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, বদলে যায় বিনোদনের মাধ্যমও। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় টম-জেরির দৌড়ঝাঁপ, মোটু-পাতলুর নানা কাণ্ড কিংবা গোপাল ভাঁড়ের বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা এখনও নতুন করে হাসায় দর্শক-শ্রোতাকে।
তিন চরিত্রের জন্ম, বিকাশ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। একজন মার্কিন অ্যানিমেশনের বিশ্বখ্যাত জুটি, অন্যজন ভারতীয় কমিকস ও অ্যানিমেশনের জনপ্রিয় চরিত্র এবং তৃতীয়জন বাংলা লোককথার দীর্ঘদিনের পরিচিত রসিক চরিত্র। কিন্তু হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার জায়গায় তাদের মধ্যে রয়েছে মিল।
বিশ্ব অ্যানিমেশনের অন্যতম পরিচিত জুটি টম ও জেরি। বিড়াল টম এবং ইঁদুর জেরির পারস্পরিক ধাওয়া, সংঘাত ও বুদ্ধির লড়াই ঘিরেই তৈরি হয়েছে অসংখ্য হাসির মুহূর্ত।
চরিত্র দুটি তৈরি করেন মার্কিন অ্যানিমেটর উইলিয়াম হ্যানা ও জোসেফ বারবেরা। ১৯৪০ সালে ‘Puss Gets the Boot’ নামের অ্যানিমেটেড শর্টে প্রথমবার দর্শকের সামনে আসে এই জুটি। শুরুতে বিড়ালটির নাম ছিল জ্যাসপার এবং ইঁদুরটির নাম জিনক্স। পরে তারা টম ও জেরি নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।
টম-জেরির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো সংলাপের চেয়ে শারীরিক কৌতুক, মুখভঙ্গি এবং পরিস্থিতিনির্ভর হাস্যরসের ওপর নির্ভরতা। ফলে ভাষা না বুঝলেও তাদের কর্মকাণ্ডের হাস্যরস সহজেই বোঝা যায়। এ কারণেই চরিত্র দুটি সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সীমারেখা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মোটু-পাতলু একটি পরিচিত জুটি। দুই বন্ধুর নানা বিপত্তি, ভুলভ্রান্তি এবং মজার পরিস্থিতিকে ঘিরে এগিয়ে যায় তাদের গল্প।
ফুরফুরি নগরকে কেন্দ্র করে নির্মিত অ্যানিমেটেড সিরিজে মোটু ও পাতলুর পাশাপাশি দেখা যায় জন, ইন্সপেক্টর চিংগাম, ড. ঝটকা ও ঘাসিটারামের মতো চরিত্রকে।
মোটু-পাতলুর শিকড় রয়েছে ভারতীয় কমিক স্ট্রিপে। পরবর্তীতে অ্যানিমেশন সিরিজের মাধ্যমে তারা আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। ২০১২ সালে Nickelodeon India-তে তাদের অ্যানিমেটেড সিরিজের সম্প্রচার শুরু হয়।
মোটুর খাবারের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা, বিশেষ করে সমোসার প্রতি তার আকর্ষণ, আর পাতলুর তুলনামূলক বাস্তববাদী ও হিসাবি স্বভাব, দুই বন্ধুর এই বৈপরীত্যই গল্পের অন্যতম প্রধান হাসির উপাদান।
টম-জেরি ও মোটু-পাতলুর সঙ্গে গোপাল ভাঁড়ের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তিনি মূলত অ্যানিমেশন চরিত্র নন; বাংলা লোককথায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি রসিক চরিত্র।
প্রচলিত গল্পে গোপাল ভাঁড়কে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারের ভাঁড় হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে গোপাল ভাঁড়ের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ঐতিহাসিক ব্যক্তি হলেও গোপাল ভাঁড় সত্যিই তাঁর দরবারে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
তাই গোপাল ভাঁড়কে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেয়ে বাংলা লোকসাহিত্য ও লোককথায় প্রতিষ্ঠিত একটি চরিত্র হিসেবে দেখা বেশি সতর্ক অবস্থান।
গোপাল ভাঁড়ের গল্পের মূল আকর্ষণ তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ও রসবোধ। প্রচলিত অনেক গল্পে তিনি কথার মারপ্যাঁচ, বুদ্ধি ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে জটিল পরিস্থিতির সমাধান করেন কিংবা ক্ষমতাবান ও অহংকারী ব্যক্তিকে হাস্যরসের মাধ্যমে জবাব দেন।
এ কারণেই গোপাল ভাঁড়ের গল্প শুধু হাসায় না, অনেক সময় সামাজিক ব্যঙ্গেরও সুযোগ তৈরি করে।
বিনোদনের মাধ্যম গত কয়েক দশকে আমূল বদলে গেছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্ট মানুষের বিনোদনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। ছাপা কমিকসের জায়গা নিয়েছে ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তৃত জগৎ।
তবু টম-জেরির দৌড়ঝাঁপ, মোটু-পাতলুর মজার বিপত্তি কিংবা গোপাল ভাঁড়ের তীক্ষ্ণ রসিকতা এখনও দর্শক-শ্রোতাকে আকৃষ্ট করে।
হয়তো এর কারণ খুব সাধারণ ভালো হাসির গল্পের জন্য সময়ের সঙ্গে সবকিছু বদলে ফেলতে হয় না। প্রজন্ম বদলায়, মাধ্যম বদলায়; কিন্তু সহজ, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণবন্ত হাস্যরসের আবেদন থেকে যায়।