
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একসময়ের ছোট ও সংকীর্ণ কোণার কক্ষ ছেড়ে বড় পরিসরে মূলধারায় জায়গা পাওয়ায় একে নিজেদের ‘বিরাট পদোন্নতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে আয়োজিত ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই অভিব্যক্তি জানান।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট ও ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের বন্ধু জোসে রামোস-হোর্তা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ব্রাজিলের মন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ড. ইউনূস রসিকতা করে বলেন, অতীতে এমন আয়োজনের জন্য জাতিসংঘের ছোট একটি কোণার কক্ষে স্থান মিলত এবং সবাইকে সেখানে ঠিকমতো ধারণ করা যেত না। তবে এবার সঠিক জায়গায় বন্ধুদের উপস্থিতি পাওয়ায় আয়োজনের পরিসর ও কক্ষ দুটোই বড় হয়েছে। উপস্থিতির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে তিনি যোগ করেন, এটি তাদের জন্য বড় এক পদোন্নতি, যদিও ভবিষ্যতে তারা আবার সেই কোণার ঘরে ফিরে যান কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, অধিবেশন শুরু হওয়ার মুহূর্তে তাকে পুরো সেশনের জন্য পাওয়া তাদের জন্য বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়। বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিভ্রান্তিকর ভাষার বিপরীতে সাধারণ মানুষ যাতে শান্তি ও ন্যায্যতার স্পষ্ট বার্তা পায়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
বক্তব্যের মূল অংশে অধ্যাপক ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তি এবং সামাজিক ব্যবসার বিশ্বব্যাপী বিস্তারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বিশেষ করে নিউইয়র্কসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পৌঁছে দিয়েছে এবং প্রায় শতভাগ সফল পরিশোধের রেকর্ড গড়েছে, তা তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসা কাঠামোর অধীনে গড়ে ওঠা ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টেলিমেডিসিন নেটওয়ার্ক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতালের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, লাভের অর্থ পুনঃবিনিয়োগ করেই এসব প্রতিষ্ঠান আজ নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে অধ্যাপক ইউনূস ঘোষণা দেন, চাকরিপ্রত্যাশী তৈরির সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে আগামী ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’। শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এই প্রতিষ্ঠান তরুণদের সনদের চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেবে। বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলানোর এই সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে তিনি উপস্থিত বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।