
চট্টগ্রামে সওজের ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের ঘায়েল করতে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বিএনপির তিন শীর্ষ নেতাকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি সম্পূর্ণ ‘গায়েবি’ বা কাল্পনিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মিথ্যা মামলা গ্রহণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি করা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে জেলা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে ঠিকাদার মো. আব্দুল কাদের সিকদার সাতকানিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করা হলেও সেখানে বিএনপি নেতা এমএ হাশেম রাজুকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন—গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা আফিল উদ্দিন আহমদ, চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম, সাতকানিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা ইলিয়াছ বাবুল এবং ঠিকাদার কামাল উদ্দিন চৌধুরী বাচা। এজাহারে দাবি করা হয়, আসামিরা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সাতকানিয়া থানার ১১ নম্বর কালিয়াইশ ইউনিয়নের চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ কার্যালয়ের সামনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী মিছিল করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙচুর করে উল্লাস করেছেন। অথচ স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ওইদিন ঘটনাস্থলে এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মামলার মূল নেপথ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুপক্ষের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। সড়ক বিভাগের কাজ নিয়ন্ত্রণের সুবিধةার্থে স্থানীয়ভাবে ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার সমিতি’ এবং ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি’ নামে দুটি আলাদা কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে একটির নেতৃত্বে রয়েছেন চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ হাশেম রাজু এবং অন্যটির নেতৃত্বে আছেন আফিল উদ্দিন আহমদ ও মো. সাইফুল ইসলাম। ঘটনার দিন সোমবার দুপুরে হাশেম রাজুর পক্ষ সড়ক বিভাগ কার্যালয় চত্বরে মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে এবং রাতে আফিল উদ্দিনের পক্ষ একটি ছোট পরিসরে আলোচনা সভা সম্পন্ন করে। বিবদমান এই দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বা নাশকতামূলক ঘটনা না ঘটলেও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ডাহা মিথ্যা এই মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ও দীর্ঘদিনের নির্যাতিত যুবদল নেতা ইলিয়াছ বাবুল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ১৭ বছর আওয়ামী লীগের আমলে অসংখ্য গায়েবি মামলার শিকার হওয়ার পরও এখন নিজের দলের আমলেও মিথ্যা মামলার আসামি হতে হলো, অথচ তিনি ওই রাতের বৈঠকে উপস্থিতই ছিলেন না। এদিকে সাতকানিয়া থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং বর্তমানে তা তদন্তাধীন। তবে এ ধরনের ভিত্তিহীন মামলা গ্রহণ করার ঘটনায় জেলা পুলিশ সুপার অবিলম্বে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রైম অ্যান্ড অপস) ও সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছে।