
নিত্যপণ্যের বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষাব্যয়। অথচ সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে সংসারের খরচ সামলাতে একের পর এক প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাঁটাই করছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস ও ফলমূল বাদ দিয়ে এখন পুষ্টির চাহিদার চেয়ে শুধু পেট ভরার খরচ মেটানোই তাদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বিনোদনেও টান পড়তে শুরু করেছে। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়াও এখন অনেকের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। জরুরি নয় এমন কেনাকাটা বাদ দিয়েও মাস শেষে হিসাব মেলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে তা বেড়ে ৯.৩২ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে গত বছরের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ মানুষের ওপর অনেক বেশি রয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তারা প্রথমে বিলাসী ব্যয় এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পণ্যেও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুষ্টি, শিক্ষা ও মানসিক স্বস্তির ওপর। বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩৮ হাজার টাকা বেতনের বেসরকারি চাকরিজীবী বা ৩১ হাজার ৮০০ টাকা আয়ের সেলস এক্সিকিউটিভদের অনেকেই বাড়তি দামের কারণে পরিবারে মাছ-মাংস বা আপেল-কমলার মতো পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত কিনতে পারছেন না। তুলনামূলক সস্তা ব্রয়লার মুরগি কিংবা পাঙাশ মাছ কেনাও এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
খাবারের পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসার বাড়তি খরচ সাধারণ মানুষের বাজেটকে পুরোপুরি ওলোটপালট করে দিচ্ছে। কেরানীগঞ্জের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাধারণ ভোক্তাদের ভাষ্যমতে, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, যাতায়াত এবং সন্তানদের স্কুল-কলেজের খরচ মেটাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ধারদেনা। ৪৫ হাজার টাকা আয়ের এক বেসরকারি চাকরিজীবীর পারিবারিক বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে তার অন্তত ৫ হাজার ৬০০ টাকার ঘাটতি থাকছে। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ায় টিকে থাকার জন্য মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে বা ঋণ করতে হচ্ছে, আর যাঁদের সঞ্চয় বা ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই, তারা আরও শোচনীয় অবস্থায় রয়েছেন। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির এই তীব্র অভিঘাত মানুষের শুধু বাজার ও অর্থনীতিকেই নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, পুষ্টি ও সামাজিক সম্পর্ককেও মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে ফেলছে।