
রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণে সরকার একসঙ্গে তিনটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করলেও এর মধ্যে দুটি বড় প্রকল্পের অর্থায়ন এবং নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কেবল একটিমাত্র দেশের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদিত তিনটি মেট্রো প্রকল্পের মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)—এই দুই প্রকল্পেরই প্রধান অর্থায়নকারী সংস্থা হলো জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। এই দুই প্রকল্প মিলিয়ে শুধু জাপানি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি; যার মধ্যে এমআরটি-১ এ ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) এ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা জাইকা থেকে আসছে। শুধু অর্থায়ন নয়, নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এই জাপানি নির্ভরতা অত্যন্ত স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তার মতে, মেট্রোরেলের দরপত্র প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে সীমিত টেন্ডারিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে, কারণ প্রকল্পগুলোর নকশা এমনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং ঠিকাদারদের এমন নির্দিষ্ট নির্মাণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে যা মূলত জাপানি পেটেন্ট বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর। ফলস্বরূপ, এই ধরনের জটিল কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা কেবল জাপানি ঠিকাদারদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তিনি ঢাকায় বিভিন্ন বিদেশি অর্থায়ন চুক্তির অধীনে চলমান মেট্রো প্রকল্পগুলোর ব্যয় এবং ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলনামূলক পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে এর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে একই সময়ে অনুমোদিত তৃতীয় প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ)-এ, যেখানে অর্থায়নে বৈচিত্র্য এনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মোট ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থ ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা আসছে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে। অর্থাৎ, একসঙ্গে অনুমোদিত তিনটি প্রকল্পের মধ্যে একটিতে একাধিক দাতা সংস্থা যুক্ত থাকলেও বাকি দুটিতে কার্যত একক দেশনির্ভর কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই একক নির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্নও। জাপানি অর্থায়নে পরিচালিত এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (উত্তর) এই দুই প্রকল্পেই মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় সমান তালে যথাক্রমে ১১৭.৬৪ শতাংশ এবং ১১৭.৮৭ শতাংশ। এই দুই প্রকল্পে কেবল বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশের প্রযুক্তি এবং ঋণের ওপর এই অতিমাত্রায় নির্ভরতা ভবিষ্যতে দেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া পরবর্তীতে নিয়মিত খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা প্রযুক্তির যেকোনো ধরনের হালনাগাদের ক্ষেত্রেও একই দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকার মারাত্মক ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।