
বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর বিকল্প উপায় খুঁজতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক আধিপত্য নিয়েও নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রায় দুই বছর পর বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণের বোঝা, পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং আইনগত সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চীন বিভাগের সাবেক প্রধান এসওয়ার প্রসাদ উল্লেখ করেছেন যে, ভূরাজনৈতিক কারণ এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ডলারকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ফলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি বিনিয়োগকারীরা এখন ডলারভিত্তিক সম্পদ থেকে নিজেদের পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য এবং এআই অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে, তবুও বন্ডবাজারে ক্রমবর্ধমান চাপের লক্ষণ স্পষ্ট। ঋণের উচ্চ হার ও আস্থার সংকটের কারণে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা দাবি করায় ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া নরওয়ের ওয়েলথ ফান্ডের মতো বৃহৎ সার্বভৌম তহবিলও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে নিজেদের বিনিয়োগ কমিয়ে বিকল্প ভালো আয়ের উৎস খুঁজছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ডলারের আধিপত্য এখনও প্রায় ৯০ শতাংশ হলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে এর অংশীদারত্ব ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভের ৬৪ শতাংশ ডলারে থাকলেও ২০২৫ সালের শেষে তা ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলাতে এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অনেক দেশ ডিজিটাল মুদ্রা ও প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যৌথভাবে ‘এমব্রিজ’ নামের আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নে কাজ করছে, যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে দ্রুত ও সাশ্রয়ী লেনদেনের সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও ভারতও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। শুধু ডিজিটাল মুদ্রাই নয়, বরং বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর প্রবণতাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে সংরক্ষিত স্বর্ণের পরিমাণ বিদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেছে এবং একই বছর প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো মার্কিন ভল্ট থেকে তাদের শত শত টন স্বর্ণ নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও ঋণ বৃদ্ধি, নিষেধাজ্ঞার অতিব্যবহার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব এখন বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।