
মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইতসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের দায়িত্বশীলদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মাসিক সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের আর্থিক ও সামাজিক মূল্যবোধ নিশ্চিতে সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা নীতিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক এই নীতিমালা জারি করা হয়, যা গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।
সরকারের এই নতুন উদ্যোগের আওতায় কারা মাসিক সম্মানী পাবেন, আবেদনের শর্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো:
কারা কত মাসিক সম্মানী পাবেন: নীতিমালা অনুযায়ী, উপাসনালয়ের ধরন ও পদমর্যাদা অনুযায়ী তিন স্তরে এই সম্মানী দেওয়া হবে—
প্রথম স্তর (মাসে ৫,০০০ টাকা): ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যক্ষ এবং যাজক/পালক।
দ্বিতীয় স্তর (মাসে ৩,০০০ টাকা): মুয়াজ্জিন, সেবাইত, বিহার উপাধ্যক্ষ এবং সহকারী যাজক/পালক।
তৃতীয় স্তর (মাসে ২,০০০ টাকা): খাদেম। (উল্লেখ্য, এই সম্মানী কোনো সরকারি বেতন বা ভাতা হিসেবে গণ্য হবে না; এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মানী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর ভিত্তিতে কেউ স্থায়ী সরকারি চাকরির দাবি করতে পারবেন না।)
সম্মানী পাওয়ার যোগ্যতা:
আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কর্তৃক দেওয়া বৈধ নিয়োগপত্র থাকতে হবে।
উপজেলা কমিটি বা সিটি করপোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত উপাসনালয়ে কর্মরত থাকতে হবে।
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, ট্রাস্ট বা অন্য কোনো বিদেশি সংস্থা ও প্রকল্প থেকে ইতোমধ্যে নিয়মিত বেতন-ভাতা বা অনুদান প্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন না।
তুলনামূলক কম আয়ের এবং প্রত্যন্ত বা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার উপাসনালয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। মসজিদের ক্ষেত্রে জুমার নামাজ আদায়ের শর্ত থাকলেও হাওর, পার্বত্য ও চরাঞ্চলের ক্ষেত্রে এটি শিথিলযোগ্য।
আবেদনে যেসব কাগজপত্র লাগবে: নির্ধারিত ফরমে আবেদন করার সময় সঙ্গে যে কাগজগুলো জমা দিতে হবে— ১. জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) স্পষ্ট ফটোকপি। ২. দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি। ৩. সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র। ৪. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত নিয়োগপত্রের কপি। ৫. নিজের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের ব্যাংক স্টেটমেন্ট অথবা এমআইসিআর চেকের পাতার স্পষ্ট কপি এবং রাউটিং নম্বর। ৬. মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ নিতে চাইলে প্রার্থীর নিজস্ব এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত মোবাইল অ্যাকাউন্ট নম্বর।
কোথায় ও কীভাবে আবেদন করবেন: আগ্রহী ব্যক্তিদের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার আবেদনকারীরা সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এবং উপজেলা পর্যায়ের আবেদনকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন জমা দেবেন। প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় কমিটি ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং প্রতিটি উপাসনালয়ের জন্য একটি ইউনিক পরিচিতি নম্বর দেওয়া হবে। এই সম্মানির অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে আইবাস++ (iBAS++) সিস্টেমের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারে পৌঁছে যাবে।
যেসব কারণে সম্মানী বাতিল হতে পারে: নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলে, প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে, তথ্য বা নথিপত্র জালিয়াতি প্রমাণিত হলে, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে এই সম্মানী বাতিল করা হবে। এছাড়া কোনো সম্মানিভোগী মৃত্যুবরণ করলেও তার সম্মানী স্থগিত বা বাতিল বলে গণ্য হবে। কমিটির সিদ্ধান্তে কোনো আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।