
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ধাক্কা ক্রমেই গুরুতর আকার ধারণ করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। এর ফলে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। যুদ্ধজনিত সরবরাহ বিঘ্ন ও বেশি দামে জ্বালানি আমদানির কারণে গত মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের বাণিজ্য, অর্থ, নৌপরিবহণ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং প্রবাসীকল্যাণ এই পাঁচ মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য ও মতামত পাঠাতে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শাখা থেকে জারি করা এই চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব বাণিজ্য, নৌপরিবহণ, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধের আর্থিক অভিঘাত বোঝাতে বেশ কিছু বড় পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে বিপিসির লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে সংকট নিরসনে হাত গুটিয়ে বসে নেই সরকার। কাজাখস্তান থেকে ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি তিন মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ এবং আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এই যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হরমুজ সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহণে ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া চারগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের আগে চট্টগ্রাম থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে কনটেইনারপ্রতি খরচ ১ হাজার ৫০০ ডলার হলেও বিকল্প রুটে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫০০ ডলার। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্ডার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে এবং সারের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন মিলিয়ে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তাই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই শ্রমবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা মোকাবিলায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।