
দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংকট এবং তথাকথিত ‘কালচারাল লীগের’ মানসিকতার রোগ বহু আগেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ ডায়াগনসিস করে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন। আবুল মনসুর আহমদের জন্মবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করে এই পোস্ট দেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে ফারুকী উল্লেখ করেন, আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে করা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ বর্তমান সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মূল কারণকে স্পষ্ট করে। তার উদ্ধৃতি টেনে ফারুকী বলেন, বিগত দিনে আমাদের লেখক-সাহিত্যিকরা যেভাবে পশ্চিম বাংলার ভাষাকে অধিকতর শুদ্ধ ও সাহিত্যের উপযোগী মনে করতেন এবং মনের দিক থেকে পূর্ব বাংলায় না থেকে পশ্চিম বঙ্গে বসবাস করতেন, তা আজও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। সিনেমা নির্মাণে একসময় কলকাতা আর্ট হাউজ বা বলিউডকে অন্ধের মতো অনুকরণ করার পেছনেও এই কালচারাল উপনিবেশের দাসত্ব কাজ করেছে বলে মনে করেন তিনি। ফারুকীর মতে, সমস্যাটি এত আগে শনাক্ত হওয়া সত্ত্বেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কেন এই লড়াই চালিয়ে যেতে হলো, তার কারণ হলো আমরা সঠিক সময়ে আবুল মনসুর আহমদের মতো প্রতিভাদের যথাযথভাবে সেলিব্রেট বা মূল্যায়ন করতে পারিনি। তার পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ আধুনিকতার নামে ভুয়া রিয়েলিটিকেই প্রগতিশীলতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
নব্বইয়ের দশকের পরের পরিবর্তন নিয়ে ফারুকী লেখেন, পরবর্তী সময়ে শিল্পে নিজেদের ভাষা, স্বর ও সুর ব্যবহার শুরু করায় সেই তথাকথিত প্রগতিবাদীদের কাছ থেকে তাদের বিভিন্ন ব্রাকেটে ফেলে ছোট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কখনো নিজেদের গানকে ‘ফোক’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ আবার কখনো নিজেদের ‘ভাষাসন্ত্রাসী’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। তবে বাঙালির নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অবধারিত ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে বহু বছর ধরে এই সাংস্কৃতিক কাজগুলোই ভিত তৈরি করেছে। এছাড়া সেকুলারিজমের নামে ধর্মবিদ্বেষ এবং ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানানোর বিরোধিতায় আবুল মনসুর আহমদের লেখা ও দর্শনের কথাও পোস্টে স্মরণ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। সমাজের পরিবর্তন ও কালচারাল স্ট্যাটাস কো-কে চ্যালেঞ্জ করার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘সেলিব্রেটিং বাংলাদেশি লেজেন্ডস’ নামে একটি বছরব্যাপী ধারাবাহিক আয়োজন ও ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশনা দেওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।