
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ বাড়লেও এর জেরে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে বিশাল অঙ্কের বাড়তি ব্যয়ের চাপ। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এর জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হলেও বর্তমান বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রেক্ষাপটে এই বিশাল অর্থের সংস্থান করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খাতের চাপ এবং রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতার মাঝে ঋণ করে বা বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে এই বেতন দেওয়া হলে তা দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা চাপ তৈরি করবে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার অবশ্য একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর না করে মূল বেতন তিন ধাপে এবং ভাতা ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে এককালীন বড় ধাক্কা এড়ানো যায়। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার বেতন-ভাতা বাড়লে তা স্থায়ী ব্যয়ের অংশে পরিণত হয়, যা প্রতি বছরই ইনক্রিমেন্ট ও পেনশনের মাধ্যমে আরও বাড়বে। রাজস্ব আয় না বাড়লে সরকারকে হয় উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে, নতুবা ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন আর্থিক সংকট কমলে দুর্নীতির প্রবণতা কমতে পারে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান পরিষ্কার জানিয়েছেন, শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমে না; এর সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদেরসহ বছরওয়ারি সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। তবে এর ফলে অর্থনীতিতে চার বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ও বিনিয়োগ ধরে রাখা এবং দুর্নীতি ও অপচয় কমানো। জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ ও সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের দুরবস্থা বিবেচনায় এই বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব রোধে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়াও মনে করেন, শুধু বেতন দিয়ে দুর্নীতি থামানো সম্ভব নয়, এর জন্য কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি।