
একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। বর্তমান সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোট সরকারের বিভিন্ন কাজের কড়া সমালোচনার পাশাপাশি সংসদ ও রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে বেশ সরব রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে একটি অলিখিত যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে দুই পক্ষই পথ চলছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে একসঙ্গে আন্দোলন করা এই দুই রাজনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করবে না এবং কোনো পক্ষই এমন কোনো চরম পদক্ষেপ নেবে না যা থেকে কোনো তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটতে পারে।
বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৯০টি আসন রয়েছে। parliamentary democracy বা সংসদীয় গণতন্ত্রের বিচারে ৯০ সদস্যের এই শক্তিশালী বিরোধী দলটিকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। সরকারের প্রথম থেকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিরোধী দল দফায় দফায় ওয়াক আউট করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করেছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের আশঙ্কায় বিরোধী দল সংবিধান সংস্কার কমিটির কোনো সদস্য দেয়নি এবং রাজপথে লংমার্চ ও মহাসমাবেশের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও প্রশ্ন উঠেছে যে, অতীতে জাতীয় পার্টির মতো এই বিরোধী দলও সরকারের ‘অনুগত বিরোধী দল’ কি না।
পক্ষান্তরে, সদ্য সমাপ্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেই প্রার্থী দেওয়া এবং নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করা কিংবা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়গুলো রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন যে বর্তমান বিরোধী দলের কার্যক্রমে তাদের অনুগত বলেই মনে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আরেকটি জাতীয় পার্টিতে পরিণত করতে পারে। তবে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন যে বিরোধী দলকে মূল্যায়ন করার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিএনপি নেতারা বলছেন, যারা এই বিরোধী দলকে অনুগত বলে আখ্যায়িত করছেন, তারা মূলত পতিত ফ্যাসিস্টের দোসর এবং দেশে আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য উসকানি দিচ্ছেন।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এই অভিযোগ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন যে, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে এবং সংঘর্ষে তাদের নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে, তাতে তাদের কোনোভাবেই পাতানো বা অনুগত বিরোধী দল বলা চলে না। একইভাবে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষারও উল্লেখ করেছেন যে, একটি মহল দেশে পুনরায় হানাহানি, হরতাল-অবরোধ ও সংঘাতের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এ ধরনের উসকানিমূলক কথা ছড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে, কঠোর আন্দোলন ও রাজপথের চাপ বজায় রাখলেও ১১ দলীয় ঐক্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি বড় কোনো সংঘাতে না গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতির ধারায় টিকে থাকার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।