
শহরের অলিতে-গলিতে এখন একটাই আলোচনা, কবে কাটবে এই গ্যাস সংকট। তবে সাধারণ মানুষের এই উৎকণ্ঠার মাঝেই আশার বাণী শোনালেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সম্প্রতি সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে গ্যাস সংকট চিরস্থায়ী নয় এবং খুব শীঘ্রই দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
সাম্প্রতিক এই গ্যাস সংকটের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন যে হঠাৎ করে এফএসআরইউতে ঘটা দুর্ঘটনার কারণে কয়েক দিনের এই সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল না। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বা অদক্ষতার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে তিনি জানান যে সরকার নিজেই এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। কোথাও কোনো অনিয়ম বা গাফিলতির তথ্য পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি করে নতুন দক্ষ মুখ আনা হচ্ছে।
বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে কেবল বর্তমান সরকারের এক বছরের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে এটিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের দেশীয় জ্বালানি খাতের কাঠামোগত ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির বাড়তি চাহিদার একটি সম্মিলিত ফল হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। সাধারণ জনগণের প্রতি সহনশীল থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন যে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ধাপে ধাপে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে। শিল্পকারখানাগুলোকে সচল রাখতে এবং উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বকেয়া বা রানিং বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ১২ মাসের সহজ কিস্তিতে পরিশোধের একটি বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গ্যাসের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে অতি দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোলায় প্রচুর পরিমাণে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে এবং এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে নাকি এলএনজিতে রূপান্তর করে আনা হবে তা নিয়ে কাজ চলছে।
বিদেশি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা চিরতরে কমিয়ে আনতে দেশীয় উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস উত্তোলনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে এক হাজার সাতশ ৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলনের উদ্দেশ্যে দেড়শটি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক জরিপে বিশাল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের কথা উঠে এসেছে যেখানে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে বর্তমানে দেশের বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় এক দশমিক তিন থেকে এক দশমিক চার ট্রিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে অর্থনীতির পরিধি বাড়ার সাথে সাথে এই জ্বালানি চাহিদাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গত বছরের এই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম বারো থেকে চৌদ্দ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে চব্বিশ ডালারে গিয়ে ঠেকেছে। আগামীতে এই দাম আরও বেড়ে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর শীত মৌসুমের আগে অতিরিক্ত গ্যাস মজুত করার প্রবণতা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
বেশি দামে চরম চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেওয়া হবে নাকি স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে, সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই ধরনের অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সাথে আলোচনা চলছে এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির প্রক্রিয়া জোরালো করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে অর্থনীতির সম্পূর্ণ ভালো অবস্থায় ফিরে আসতে আনুমানিক দুই বছর সময় লাগতে পারে, তবে এর অর্থ এই নয় যে এই পুরো সময়জুড়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। বরং সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপে ধাপে ধাপে পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি ঘটতে থাকবে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি খাত নিয়েও সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতির কথা জানান তিনি। দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং কোনো ঘাটতি নেই, তবে কিছু অসাধু ডিলার সময়মতো সার উত্তোলন না করায় সাময়িক যে ছোটখাটো জটিলতা তৈরি হচ্ছে তা কঠোরহস্তে দমন করা হবে। বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব মাথায় রেখে সরকার সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।