
আলোচিত ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায় বিচারিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিম্ন আদালতের দেওয়া মূল রায়ে ১৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তাকে যথাযথ বা বিচারিক মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে না উচ্চ আদালত। হাইকোর্ট বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই সময় ফেনী জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ যথাযথ বিচারিক বিবেচনাবোধ বা মানসিকতা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যে কারণে তাঁকে সব ধরনের ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ সোমবার চাঞ্চল্যকর এই মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ শুনানি ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পর আদালত এই মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুজন হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত শাহাদাত হোসেন শামীম। একই সঙ্গে এই মামলায় চারজনকে যাবজ্জীবন কারদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১০ জন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় দাগ কেটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলার অপরাধে ফুঁসে উঠেছিল তার অনুসারীরা। ওই বছরের ২৭ মার্চ নুসরাতের মায়ের দায়ের করা মামলার পর পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করলে কারাগার থেকেই হত্যার ছক কষা হয়। পরবর্তীতে ৩ এপ্রিল কারাগারে বসে পরামর্শের পর ৪ এপ্রিল ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন দিয়ে তাঁকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল না ফেরার দেশে চলে যান অদম্য সাহসী এই ছাত্রী। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলাসহ মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেকের এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নিয়ম অনুযায়ী রায়ের ডেথ রেফারেন্সের কাগজপত্রের পাশাপাশি আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্ট আজ মামলার চূড়ান্ত এই রায় প্রদান করলেন, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।