
বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুর রহস্যজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড একসময় পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকালে শুটিংয়ের কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর হঠাৎ নিখোঁজ হন এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। এর ঠিক পরদিন ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছ থেকে একটি বস্তাবন্দী ও দুই টুকরো মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা পরবর্তীতে শিমুর মরদেহ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার শুরুটা নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি দিয়ে হলেও দ্রুতই তা দেশের অন্যতম আলোচিত লোমহর্ষক হত্যা মামলায় রূপ নেয় এবং তদন্তে একে একে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
রাইমা শিমুর অভিনয়জগতের পথচলা শুরু হয়েছিল মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিখ্যাত পরিচালক কাজী হায়াতের নজর কাড়ার সৌভাগ্য হয় তার। তার অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েই পরিচালক তাকে ‘বর্তমান’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ দেন, যা ১৯৯৮ সালে মুক্তির মধ্য দিয়ে তার বড় পর্দায় সফল অভিষেক ঘটে। এরপর একে একে প্রায় ২৫টি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি প্রায় অর্ধশতাধিক টিভি নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জামাই শ্বশুর’ ছিল তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। অভিনয়জীবনের একপর্যায়ে ঢাকার ব্যবসায়ী শাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং ২০০৪ সালে তারা ভালোবাসার টানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পরও তিনি টেলিভিশনে অভিনয় চালিয়ে যান, অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন এবং নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন। সংসার জীবনে তাদের দুটি সন্তান ছিল এবং তারা ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় বসবাস করতেন।
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি রবিবার সকালে স্বাভাবিক নিয়মে শুরু হলেও দিনটি শেষ হয়েছিল এক ভয়ংকর ট্রাজেডিতে। স্বামীর দাবি অনুযায়ী সেদিন সকাল ৭টার দিকে শুটিংয়ের কথা বলে রাইমা বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি গন্তব্যে পৌঁছাননি। তার বোন ফাতিমা নিশা বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে শাখাওয়াতকে বিষয়টি জানান। তখনো পরিবারের ধারণা ছিল শিমু হয়তো কোনো কারণে নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু ১৭ জানুয়ারি সকালে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে একটি সন্দেহজনক বস্তা দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ সেই বস্তা খুলে দুই টুকরো ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। মিটফোর্ড হাসপাতালে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম মরদেহটি তার বোনের বলে শনাক্ত করেন।
তদন্তের শুরুতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদ নিয়ে অতীতে অভিনেতা জায়েদ খানের সঙ্গে শিমুর বিরোধের বিষয়টি সামনে আসায় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে সেই সূত্রে তদন্ত বেশিদূর এগোয়নি। এরপর তদন্তের মোড় ঘুরে যায় রাইমার পরিবারের ব্যবহৃত গাড়িটির দিকে। গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে তীব্র ব্লিচের গন্ধ পান তদন্তকারীরা, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় আলামত মুছে ফেলার জন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল। পাশাপাশি গাড়ির ভেতর থেকে নাইলনের দড়ির একটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়, যার সঙ্গে শিমুর মরদেহ পেঁচানো বস্তাটির নিখুঁত মিল পাওয়া যায়। এই জোরালো প্রমাণগুলো পুলিশকে নিশ্চিত করে যে রাইমার মরদেহ বাসা থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত করার ক্ষেত্রে এই গাড়িটিই ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে পুলিশ রাইমার স্বামী শাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদসহ মোট ছয়জনকে আটক করে রিমান্ডে নেয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে স্বামী শাখাওয়াত তার স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে পারিবারিক বনিবনা না হওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে শাখাওয়াত তাকে মারধর করেন এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর বন্ধু ফরহাদকে বাসায় ডেকে এনে গৃহকর্মীকে কৌশলে বাইরে নাশতা কিনতে পাঠিয়ে তারা মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন। তারা বটি বা অন্য কিছু দিয়ে মরদেহ দুই টুকরো করে বস্তাবন্দী করেন এবং পরিবারের গাড়ির ডিকিতে তুলে রাখেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই দিন বিকেলে মরদেহ গুম করতে বের হলেও দিনের আলো বেশি থাকায় তারা ব্যর্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসেন। এরপর রাতের বেলা তারা কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে নির্জন স্থানে গিয়ে ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে আসেন এবং ঢাকায় ফিরে আসেন। পরদিন সকালে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শাখাওয়াত থানায় গিয়ে স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরি করেন। তদন্তে আরও উঠে আসে যে দাম্পত্য জীবনে শাখাওয়াত প্রায়ই রাইমাকে সন্দেহ করতেন এবং পরকীয়ার অভিযোগ তুলে নির্যাতন চালাতেন। করোনাকালের আর্থিক সংকটের পর শিমুই পরিবারের মূল উপার্জনকারী হয়ে ওঠায় তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও চরমে পৌঁছেছিল। মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগেও রাইমা তার বোনের কাছে স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের পর আটক থাকা অবস্থায় শাখাওয়াত তার মেয়েকে ফোন করে মায়ের মৃত্যুর জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। দীর্ঘ মঞ্চ ও টেলিভিশন ক্যারিয়ারের অধিকারী রাইমা শিমুর এমন নির্মম পরিণতি আজও দেশের শোবিজ অঙ্গনের মানুষকে শিহরিত করে।